1438712035
পৃথিবীতে এসেই শিশুটি মায়ের কোলছাড়া। নিদিষ্ট সময়ের দেড় মাস আগেই এই ধরনীতে চলে আসে সে। তবে এই আগেভাগে চলে আসা কোন সুখকর কারণে নয়। সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শিশুটি মায়ের পেটে গুলিবিদ্ধ হয়। মা নাজমা বেগমকে দ্রুত ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। জন্ম হয় এক কন্যা শিশুর। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ২৬ জুলাই নিয়ে আসা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ভর্তি খাতায় নাম লেখা হয় ‘বেবি অব নাজমা’।

শিশুটির পিঠে প্রথম গুলি লাগে। সেটি বুক দিয়ে বের হয়। মায়ের গর্ভে জড়োসরো হয়ে থাকে সন্তান। তাই গুলিটি পিঠের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে বুকের ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে ডান হাত ছিদ্র করে গলায় পাশ দিয়ে ডান চোখে আঘাত লাগে। ডান চোখের কর্ণিয়ায় এখনো রক্ত জমাট বেধে আছে। শিশুটির বয়স গতকাল মঙ্গলবার হয় ১৩ দিন। ওজন ১৮৫০ গ্রাম। আজ বুধবার তাকে চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক দেখতে আসবেন। তারা চোখের ইনজুরি বিষয়ে চিকিত্সা ও পরামর্শ দিবেন।

এছাড়া শিশুটির হার্টে ছিদ্র আছে জন্মগতভাবে। হাপাতালে ভর্তির পর ছোট্ট এই শরীরে অপারেশন চালানো হয়েছে। হাতের চামড়ায় দেখা দেয় ইনফেকশন। শরীরে পানি জমেছে। হয়েছে জন্ডিসেও আক্রান্ত। শরীর এবং মুখে ফাঙ্গাস পড়েছে।

এই অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউনেটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা: আবিদ হোসেন মোল্লার নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ টিম শিশুটির চিকিত্সা দেখভাল করছেন। এই টিমে শিশু, হূদরোগ, প্লাস্টিক সার্জন এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এই টিম প্রতিদিন দুই দফা বসে শিশুটির চিকিত্সা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

প্রথমে এই শিশুকে ফিল্টারে করে দুই সিসি মায়ের দুধ দেয়া হয়। শিশুটি স্বাভাবিকভাবেই মায়ের দুধ খায়। পরে গতকাল শিশুকে ১০ সিসি মায়ের দুধ খেতে দেয়া হয় এবং শিশুটি সেই দুধ খায়। এদিকে জন্মের ১১ দিন পর গুলিবিদ্ধ মা নাজমা বেগম প্রথমবারের মতো দেখতে ঢাকা আসেন। গুলির আঘাত, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা, ডাইবেটিস নিয়ে নাজমা বেগম প্রায় পৌনে দুই শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে আসেন গত বৃহস্পতিবার। এখন আছেন গাইনি ওয়ার্ডে। গত সোমবার হুইল চেয়ারে করে নাজমা আদরের ধনকে দূর থেকে দেখার জন্য আইসিউতে আসেন। কিছুক্ষণ থেকে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ওয়ার্ডে ফিরে যান।

এদিকে এই শিশুকে ২৪ ঘন্টা ডিউটি ডাক্তার, নার্সরা মায়ের মমতায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। শিশুর অবস্থা এখন অনেকটাই উন্নতির দিকে। শিশুটিকে আগামী ২/১ দিনের মধ্যে মায়ের সঙ্গে কেবিনে পাঠানো হবে। মা-মেয়ের মিলন হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউনেটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা: আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, চিকিত্সাধীন শিশুটির অবস্থা উন্নতির দিকে। শিশুটির জন্ডিসের মাত্রা কমে আসছে। পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত না হওয়ায় হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের স্পেশাল কেয়ার বেবি ইউনিটে শিশুটিকে রাখা হয়েছে। তবে ২/১ দিনের মধ্যেই মা-মেয়েকে একই কেবিনে আনা হবে।

জানা যায়, শিশুটিকে ২৬ জুলাই সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: কানিজ হাসিনা শিউলির অধীনে ভর্তি করা হয়। প্রথমে ইনকিউবিটরে রেখে স্বাভাবিক করা হয়। পরে সব ধরনের সেবা দেয়া হয় এবং অপারেশন করা হয়। ২৯ জুলাই হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের স্পেশাল কেয়ার বেবি ইউনিটে নেয়া হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান নিজেই শিশুটির চিকিত্সা ব্যবস্থার মনিটরিং করছেন। সরকার চিকিত্সা ভার বহন করছে। কেবল এই শিশুই নয় সকল ক্ষেত্রে যেভাবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চিকিত্সা সেবা দিচ্ছে সেহেতু এই প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া উচিত বলে অনেকেই জানিয়েছেন।

শিশুটির বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, আমি গরীব মানুষ। এই চিকিত্সা করানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমসহ অন্যান্য মন্ত্রীরা যেভাবে সহায়তা করলেন এই ঋণ কখনো শোধ করতে পারবো না। ডাক্তার, নার্সরা যেভাবে সেবা করছেন তাদের জন্য দোয়া করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই। আমার মেয়ে এবং মেয়ের মায়ের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। সবাই দোয়া করবেন। এদিকে মঙ্গলবার রাতে শিশুটির নাম রাখার কথা জানান বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া। তিনি বলেন, বড় মেয়ে সুমাইয়ার সঙ্গে মিল রেখে নবজাতকের নাম সুরাইয়া রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ মা নাজমা বেগম ও তার মেয়েকে দেখতে যান। মন্ত্রী শিশুটির শয্যাপাশে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। এসময় তিনি আবেগাআপ্লুত হয়ে পড়েন।

পরে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই মা ও শিশুর চিকিত্সায় যাতে কোনো ত্রুটি না হয় তা দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। অপরাধীদের উপযুক্ত বিচারের আওতায় আনা হবে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন ও বিরল। মৃতপ্রায় মা ও শিশুকে সুস্থ করে তোলার পেছনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের যে চিকিত্সকেরা পরিশ্রম করছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি। মা ও শিশুর অবস্থা দিন দিন উন্নতি হচ্ছে বলেও সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।

এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: দীন মোহাম্মদ নুরুল হক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান, শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা: আবদুল হানিফ, সহযোগী অধ্যাপক ডা: কানিজ হাসিনা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এইচ এম কামারুজ্জামানের অসুস্থ সহধর্মীনি জাহানারা জামানের চিকিত্সার খোঁজ খবর নিতে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে যান। এছাড়া গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে দেখতে মঙ্গলবার হাসপাতালে যান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। এসময় তিনি চিকিত্সার জন্য ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন।

উল্লেখ্য, গত ২৩ জুলাই মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন অন্ত:সত্ত্বা নাজমা বেগম। জরুরি অস্ত্রোপচারের পর মাগুরা সদর হাসপাতালে তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। মায়ের পেটে থাকা শিশুটির পিঠে গুলি লেগে বুক দিয়ে বেরিয়ে যায়। সংকটাপন্ন অবস্থায় গত রবিবার সকালে আনা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

হীরা পান্নাজাতীয়
পৃথিবীতে এসেই শিশুটি মায়ের কোলছাড়া। নিদিষ্ট সময়ের দেড় মাস আগেই এই ধরনীতে চলে আসে সে। তবে এই আগেভাগে চলে আসা কোন সুখকর কারণে নয়। সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শিশুটি মায়ের পেটে গুলিবিদ্ধ হয়। মা নাজমা বেগমকে দ্রুত ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। জন্ম হয় এক কন্যা শিশুর। অবস্থার...