9_108134
সারা দিন আকাশে উড়ে, এখানে ওখানে ঘুরে, পাখিরা নিজেদের চেনা গাছের ডালে ফিরে আসে অন্ধকার নামার আগেই। বড় মাছেরা নেমে যায় জলের নিচে, কাদার উপর স্থির হয়ে থাকে সারা রাত। মানুষেরা কেউ কেউ কি চায় যে যার মতো জীবন কাটিয়ে শেষবেলায় তার বাল্যভূমিতে ফিরে যেতে! হয়তো চায়! কিন্তু প্রতিবন্ধকতা অনেক। এই আমি সেই কবে থেকে স্বপ্ন দেখি, চলে যাওয়ার আগে অন্তত বছর দশেক আংরাভাসা নদীর গায়ে একটা দু-ঘরের বাংলো তৈরি করিয়ে তার বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে খুঁটিমারির জঙ্গল দেখে তৃপ্ত হব। স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে গেল। অথচ ওই নির্জনে দু-ঘরের বাংলো জমি কিনে বানানোর জন্য যে খরচ হবে তা এখন আমি স্বচ্ছন্দে করতে পারি। কিন্তু আমার চারপাশ আমাকে এমন গভীরভাবে জড়িয়ে রেখেছে যে, তাকে ছিন্ন করে আমি আমার প্রিয় নদীর পাশে যেতে পারছি না। অথচ চোখ বন্ধ করলেও দুটো জায়গা স্পষ্ট দেখতে পাই। প্রথমটা গয়েরকাটা চা-বাগান থেকে ডুডুয়া নদীর মাঝখানে হাইওয়ে থেকে মিনিট আটেক হেঁটে গেলে আংরাভাসা নদীটা দেখা যাবে ঘোড়ার নালের মতো বাঁক নিতে। দূরে খুঁটিমারির জঙ্গল। অথবা গয়েরকাটা চা-বাগানের গা দিয়ে বয়ে যাওয়া আংরাভাসার জলের ধারা যেখানে কিঞ্চিৎ গভীর তার যে কোনো একটা জায়গা। প্রতিবার যাই আর চোখ মেলে দেখি, আর দেখি। তবে আজকাল আমার জন্মভূমি গয়েরকাটায় পা রাখতেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হই। না, জায়গাটা পাল্টে গেছে। মানুষের সঙ্গে দোকানগুলোর সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি তাদের চেহারাও, কিন্তু সে কারণে নয়। গয়েরকাটায় গেলে এখন সেই দিনগুলোর স্মৃতি মনে উথাল-পাথাল হয়, এই সেদিনও যা আমাকে খুশিতে রাখত। ওই যে চা-বাগান পেরিয়ে বাজারে যাওয়ার পথে এখনো সে সেতুটি রয়ে গেছে, যার নিচ দিয়ে প্রবল স্রোত নিয়ে জল বয়ে যেত আংরাভাসার একটি অংশ হয়ে ফ্যাক্টরির দিকে, প্রয়োজন না থাকায় সেটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে খাতে জল বইত, সেখানে এখন শুকনো পাথর, ঘরবাড়িও তৈরি হয়ে গেছে। ওই হাড়জিরজিরে শুকনো খাতটি যেন আমার কাছে একটি প্রতীক হয়ে থেকে গেল যা অতীতের স্মৃতি মনে পড়ায়। আমার বালকবেলার বন্ধুদের প্রায় সবাই চলে গেছে। প্রথমেই মনে পড়ে, শিবদাস গুহর কথা। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণবন্ত ছিল সে। জলপাইগুড়ির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাস করে ব্যবসা শুরু করেছিল। কনস্ট্রাকশনের। কিন্তু যখন জানলাম আমাদের মধ্যে প্রথম মদ্যপান শুরু করেছে সে, তখন খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ২৫-২৬ বছরের যুবক টাকা রোজগার করছে আর সেটা বেহিসেবির মতো খরচ করছে। এখনো দেখতে পাই শিবু তার জিপ চালাচ্ছে আর ওর বুড়ো ড্রাইভার জিপের পিছনে পা ঝুলিয়ে সতর্ক ভঙ্গিতে বসে আছে যাতে দুর্ঘটনা ঘটলেই লাফিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারে। এই শিবু একবার গাড়ি নিয়ে কলকাতায় এলো। দু-পাশে দু-দিকে যাওয়ার রাস্তা, মাঝখানের উঁচু জায়গায় ট্রাম লাইন। সেখানে গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ। শিবু সেখান দিয়ে গাড়ি চালিয়ে পুলিশকে হাসতে হাসতে জরিমানা দিয়েছিল। নিজের জীবন নিয়ে খেলা করতে করতে এক সময় চলে গেল সে। কার ওপর অভিমান করে নিজেকে সে ধ্বংস করল জানি না। কিন্তু গয়েরকাটা বাজারের তেমাথা মোড়ে পা রাখলেই তাকে দেখতে পাই। দুলতে দুলতে আসছে। মুখে হাসি, ‘কিরে কেমন আছিস’! ওপাশেই থাকত তপন। তপন চৌধুরী। শিবুর একদম বিপরীত চরিত্র ছিল তার। খুব পড়াশোনা করত। আর সুযোগ পেলেই তাস খেলত। সব ব্যাপারেই সিরিয়াস ছিল তপন। তপন চলে গেছে। তার আগে গেছে দীপু। দীপক পাল। আমি আর দীপু একসঙ্গে কলকাতায় পড়তে গিয়েছিলাম। আমি স্কটিশে, সে সেন্ট পলসে। দেখা হতো ছুটিতে গয়েরকাটায় গেলে। পরে ওর মামা নিত্য গোপাল পালের কাঠের মিলে বসত সে। কি যে হলো, কেন যে হয়, চট করে তার ছিঁড়ে যায়। গয়েরকাটার চৌমাথার মোড়ের এক বাড়ির দোতলায় আমাদের তাসের আসর বসত। তপন, শিবু, দুলু, দীপু, প্রথম দিকে ব্রিজ, পরে রামি, মাঝে মাঝে বিকাশ আসত। চুপ করে বসে থাকত। এই বিকাশ অল্প বয়সে মুদির দোকান করেছিল চা-বাগানের গা ঘেঁষে হাইওয়ের পাশে। ছুটিতে গয়েরকাটায় গেলেই দুপুরের পর আমাদের ঠিকানা হয়ে যেত বিকাশের দোকান। খাঁ খাঁ চারধার। মাঝে-মধ্যে একজন কি দুজন মদেশিয়া খদ্দের আসছে। দোকানের ভিতর বসে আমরা প্রথম সিগারেটে ঠোঁট দিচ্ছি। সেই ১৫-১৬ বছর বয়সে বিকাশই ছিল আমাদের আশ্রয়দাতা। অভাবের কারণে ওর পড়াশোনা না হলেও আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়নি। শহরে বা নগরে গিয়ে যা প্রায় অসম্ভব মনে হতো তা খুব সহজেই সম্ভব ছিল গয়েরকাটার ছোট্ট জনপদে। কে মুখার্জিদের দোকানের কর্মচারী, কে বাসের কনডাক্টর তা নিয়ে মাথা ঘামাতাম না কেউ। শুধু জানতাম, এ আমার বাল্যকালের সঙ্গী। এই সম্পর্কে চিড় ধরার কথা ভাবতামই না। কিন্তু যে মুখগুলোকে নিয়ে বড় হয়েছি তাদের বেশিরভাগকে চলে যেতে হয়েছে। মানুষ জš§ায় ইচ্ছের বিরুদ্ধে। মারা যায় অনিচ্ছায়। ইচ্ছুক যারা তারা আত্মহত্যা করে। আমার বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র শিবু হয়তো আত্মহত্যা করেছিল। এখন গয়েরকাটার রাস্তায় হাঁটতে কি রকম শিরশিরানি শুরু হয় মনে। অথচ নাথুয়ার পথে মেছুয়া পুলের নির্জনতায় গেলে, আংরাভাসার পাশে ডাহুক ডাকা বিকালে বসলে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে যায়। মনে হয় এই জায়গাটা আমার। মানুষ আসে, মানুষ চলে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু মানুষের হাত না পড়লে প্রকৃতি পালটায় না। যুগ যুগ ধরে ডাহুকেরা ডেকে যায়। একটুও বদল হয় না।

শুভ সমরাটমতামত
সারা দিন আকাশে উড়ে, এখানে ওখানে ঘুরে, পাখিরা নিজেদের চেনা গাছের ডালে ফিরে আসে অন্ধকার নামার আগেই। বড় মাছেরা নেমে যায় জলের নিচে, কাদার উপর স্থির হয়ে থাকে সারা রাত। মানুষেরা কেউ কেউ কি চায় যে যার মতো জীবন কাটিয়ে শেষবেলায় তার বাল্যভূমিতে ফিরে যেতে! হয়তো চায়! কিন্তু প্রতিবন্ধকতা...