হাসান আজিজুল হক ।
একটি সংগ্রামী জাতি হিসেবে আমরা সারা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ও পরিচিতি লাভ করেছি বাহান্ন সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে। ভাষা নিয়ে অনেক দেশই আন্দোলন করেছে, তার প্রধান কারণ হচ্ছে ভাষাই একটি জাতির পরিচয়। ভাষাই জানান দেয় জাতির গৌরব ও সংস্কৃতির মান সম্পর্কে। ’৪৭ সালে বিভক্ত হওয়ার ফলে আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের নাম যখন পূর্ব পাকিস্তান হলো তখনই আমাদের বুঝতে বাকি রইল না যে, বাংলাদেশ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের উপনিবেশ হিসেবে গণ্য হতে চলেছে। এর অর্থ হচ্ছে বাঙালির জাতিসত্তা, বাঙালির স্বদেশ এখন একটি উপনিবেশ বলে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে।

এই বিষয়টা বুঝতে বাঙালির কিন্তু একটুও সময় লাগেনি। প্রথম আক্রমণটাই হলো জাতিসত্তার পরিচয় হিসেবে বাংলাভাষাকে উত্খাত করবার ষড়যন্ত্র। ১৯৪৮ সালেই ভাষা সংগ্রাম শুরু হয়ে যায় ও সেটা ’৫২ সালে তুঙ্গে উঠে এবং বাঙালি তখন বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দেয় বাংলাভাষাই বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরছে। বাংলাভাষাটি যদি কোনোভাবে সামান্য একটা স্থানীয় ভাষায় পরিণত করা যায় তাহলে জাতিসত্তাও লুপ্ত হবে। এটা এদেশের বাঙালি বুঝতে পেরেছিল একমাত্র ভাষাকে অবলম্বন করেই। সে রাষ্ট্র হিসেবে তার পরিচয় তুলে ধরতে পারবে। সেজন্যে ’৪৮ সালেই বাংলাভাষার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল।

ভারতের একজন আনকা রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্না জাতির পিতা হিসেবে কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলেন। মানুষটি এমনকি সেই অর্থে ভারতবর্ষেরই নয়। পার্সি জাতিভুক্ত গুজরাটের এই মানুষটির নিজের ভাষাও উর্দু নয়, অথচ ইনিই জাতির পিতা বা কায়েদে আযম এই প্রায় স্বঘোষিত পরিচয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের স ষ্টা হিসেবে আসন পেয়ে গেলেন। এবং নিজে উর্দুভাষী না হয়েও তিনি তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে এসে উর্দুই যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে সেই ঘোষণা দিয়ে দিলেন। কিন্তু বাঙালি জাতি যে ছাইচাপা আগুন সেটা বুঝতে পারেননি। নবসৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এই রকম ঘোষণা দিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বলে উঠল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বক্তৃতার মধ্যে এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে “না” “না” প্রতিবাদ ধ্বনি উঠলো।

বাঙালিকে চিনতে পারেননি জিন্না সাহেব এবং চিনতে চিনতেই কঠিন যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুবরণ করতে হলো তাকে। ঐ একই বক্তৃতা তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সামনেও দিয়েছিলেন। সেখানে প্রতিবাদ হয় আরো অনেক বেশি তীব্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চস্বরে জিন্নার প্রস্তাব নাকচ করলেন। জিন্না হয়ত তখনই বুঝে গিয়েছিলেন বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি।
৪৮-এর এই ভাষা আন্দোলন থেকেই একটির পর একটি আন্দোলন শুরু হয়ে গেল এবং শেষ পর্যন্ত ৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে তুঙ্গে পৌঁছল। তেভাগা আন্দোলন, ইলা মিত্রের পরিচালনায় সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটল। তার পরই ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন।

আজ এত কাল পর আমরা বুঝতে পারছি শুধু ভাষার জন্যেই এই আন্দোলন গড়ে উঠেনি, আন্দোলনের মধ্যেই ছিল উপনিবেশী শোষণের প্রতিবাদ— নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয়ে সমস্ত বাঙালিকে এক বিশাল ঐক্যবদ্ধ জনসমষ্টিতে পরিণত করা ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়ার বীজ বপণ করা।

৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম লাভ করেছে; কিন্তু পরিষ্কার বুঝা যাবে ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে যে বীজ রোপীত হয়েছিল ’৭১ সালে সে পরিণত এক উচ্চশির বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে।

[ লেখক: প্রখ্যাত কথাশিল্পী

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2018/02/6.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2018/02/6-300x214.jpgশিশির সমরাটশেষের পাতা
হাসান আজিজুল হক । একটি সংগ্রামী জাতি হিসেবে আমরা সারা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ও পরিচিতি লাভ করেছি বাহান্ন সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে। ভাষা নিয়ে অনেক দেশই আন্দোলন করেছে, তার প্রধান কারণ হচ্ছে ভাষাই একটি জাতির পরিচয়। ভাষাই জানান দেয় জাতির গৌরব ও সংস্কৃতির মান সম্পর্কে। ’৪৭ সালে বিভক্ত হওয়ার...