1440271002
গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল শনিবার প্রায় সবগুলোর নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েকটির পানি বিপদসীমার উপরে কয়েকটির বিপদসীমার কাছাকাছি ছিল। কোন কোন স্থানে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। ডুবে গেছে আমনসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষেত। কুড়িগ্রামে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:

কুড়িগ্রাম : টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে জেলার পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ধরলা নদীর পানি গতকাল বিকালে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৯ উপজেলার শতাধিক গ্রামের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। তলিয়ে গেছে ৩০ হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত। অনেক ঘর-বাড়ি ও কাঁচা সড়ক তলিয়ে গেছে। রাজারহাট উপজেলায় শুক্রবার রাতে পানিতে ডুবে সাদিয়া (৪) ও সাপের কামড়ে শাহিন (২৪) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সেতু পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি ৩৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৫১ সেন্টিমিটার, নুন খাওয়া পয়েন্টে ৫০ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার সামান্য নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় চিলমারীতে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত ৩১৬ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে।

লালমনিরহাট : তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার কাছাকাছি রয়েছে। পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে। হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রবল পানির স্রোতে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের আদিতমারীতে স্বর্ণামতি সেতুর বাইপাস সড়ক ও মূল সেতুর পাটাতন ভেঙে গেছে। শুক্রবার বিকাল থেকে বুড়িমারীর সাথে লালমনিরহাট ও ঢাকার যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

নীলফামারী : পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় শহরের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকেছে। শহরের মাছুয়া পাড়া, সওদাগড় পাড়া, কলেজ পাড়া, শাহীপাড়া, জুম্মাপাড়া, মিলনপল্লী, বারাইপাড়া, সরকার পাড়া, উকিলপাড়া, কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। পানি নিষ্কাশনের একমাত্র ড্রেনটি কাদামাটি আর আবর্জনায় ভরে থাকায় পানি বের হতে পারছে না। অথচ এই ড্রেনটি সংস্কারের জন্য প্রায় ৬৮ টন গম খরচ করা হয়েছিল। টানা বর্ষণে জেলার ছোট-বড় সব নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

গাইবান্ধা: ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সেগুলো বিপদসীমার নিচে আছে। ব্রহ্মপুত্র নদের সে াতের তীব্রতায় ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে শুরু হয়েছে নদী ভাঙন। গত ৫দিনে ভাঙনের শিকার অন্তত ৩৫টি পরিবার তাদের বসতবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ জানান, কালাসোনা, উত্তর উড়িয়া ও রতনপুর গ্রামের বেশ কয়েকটি স্থানে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে ৩৫টি পরিবার তাদের বাড়ি-ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় শুক্রবার রাত থেকেই তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে চন্ডিপুর, বেলকা, কাপাসিয়া, হরিপুর, শ্রীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার চরাঞ্চলের বাড়ি-ঘরগুলোতে পানি উঠতে শুরু করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ ফুলছড়ির তিনটি গ্রামের ভাঙনের পয়েন্টগুলো চিহ্নিত ও পর্যবেক্ষণ করতে লোকজন কাজ শুরু করেছে। ওই স্থানগুলোতে বালুর বস্তা ও জিও ব্যাগ ফেলা হবে ।
দিনাজপুর : অবিরাম বর্ষণে দিনাজপুরের ৩টি নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর গত ৩৩ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে ৮৮ মিলিমিটার। জেলার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কে ৩টি মাল বোঝাই ট্রাক ও ২টি মাইক্রোবাস বৃষ্টির কারণে উল্টে খাদে পড়ে গেছে। তবে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী আব্বাস আলী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, পুনর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার ১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিপদসীমা ৩৩ দশমিক ৫০ মিটার আর পানি প্রবাহিত হচ্ছে ৩২ দশমিক ৬০ মিটার। আত্রাই নদীর বিপদসীমা ৩৯ দশমিক ৯৫ মিটার আর প্রবাহিত হচ্ছে ৩৭ দশমিক ৬০ মিটার। ইছামতি নদীর বিপদসীমা ২৯ দশমিক ৯৫ মিটার আর পানি প্রবাহিত হচ্ছে ২৮ দশমিক ৯৫ মিটার। জেলার আবহাওয়া অফিসের সহকারী কর্মকর্তা আশিকুর রহমান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, আগামী ২ দিন পর্যন্ত হালকা ও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

রংপুর : অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রংপুর মহানগরীসহ তিস্তা নদীর তীরবর্তী গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার প্রায় ১ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ভেসে গেছে কয়েক হাজার পুকুরের মাছ। পানির নিচে তলিয়ে গেছে রংপুরের ১৪ হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেতসহ অন্যান্য ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষিসহ কৃষকদের মাথায় হাত পড়েছে। রংপুরের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, প্রতিটি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পানিবন্দী এলাকাগুলো পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পানিবন্দী মানুষদের জন্য সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। গতকাল দিনভর তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে উপজেলার নোহালী, আলমবিদিতর, কোলকোন্দ, গঙ্গাচড়া, লক্ষ্মিটারী, গজঘন্টা ও মর্নেয়া ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার পরিবার। কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার তীরবর্তী শহীদবাগ, টেপামধুপুর, হারাগাছ ও বালাপাড়াসহ ৬টি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ২০ হাজার মানুষ। পানির তোড়ে উপজেলার হারাগাছ ইউনিয়নের বকুলতলা-একতাবাজার সড়ক ভেঙ্গে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পীরগাছা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে তিস্তার তীরবর্তী পীরগাছা, তাম্বুলপুর, ছাওলা, কান্দি ও কৈকুড়ি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ।

বগুড়া : যমুনা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। সারিয়াকান্দি পয়েন্টে গতকাল দুপুর ১২টায় পানি বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। উপজেলার কাজলা, কর্নিবাড়ী, বোহাইল ও চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ১২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে, ধুনট উপজেলায় গতকাল সকালে পানির প্রবল স্রোতে শহড়াবাড়ি বাঁধের একটি অংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শহরাবাড়ি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার তিন সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল মোত্তালেব ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, আকস্মিক ভাবে স্পারের স্যাংক ধসে গেছে। তবে এই ধস ঠেকানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে সিসি ব্লক এবং জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। রঘুনাথপুর গ্রামে ভাঙনের কবলে পড়েছে পুরাতন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি।

পাউবোর সহকারী প্রকৌশলী হারুনর রশিদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, রঘুনাথপুর গ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ পুরাতন বাঁধসহ যমুনা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্প এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে। গতকাল দুপুরে বগুড়া জেলা প্রশাসক আশরাফুল ইসলাম কামালপুর ও চন্দনবাইশা ইউনিয়নের বন্যা কবলিত কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শন করেছেন।

ঝিনাইগাতী (শেরপুর) : অবিরাম বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার আরো অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করায় ক্লাস হচ্ছে না। পানিতে অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। মারা গেছে কৃষকদের হাঁস-মুরগি। প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানিসহ খাদ্যের সংকট।

সোমশ্বেরী, মহারশি ও কালঘোষা নদীর পানি গতকাল বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সোমেশ্বরী নদীর বাঁধ ভেঙ্গে ধানশাইল বাজার ও আশপাশের এলাকা পাঁচ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী মানুষ কলার ভেলা ও নৌকায় করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা যাচ্ছে। গবাদিপশু নিয়ে কৃষকরা পড়েছে মহাবিপাকে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কোরবান আলী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান। বর্ষণ ও উজান থেকে পানি আসা অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে।

শ্রীবরদী (শেরপুর) : উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে ২ সহস্রাধিক মত্স্য খামার ও পুকুরের মাছ। ডুবে গেছে আমন ফসল ও সবজির মাঠ। রানীশিমুল ইউনিয়নের প্রধান সড়কের একস্থান থেকে ভেঙ্গে গেছে। বন্ধ রয়েছে ভায়াডাঙ্গা-ঝিনাইগাতির সড়ক যোগাযোগ। রানীশিমুল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবু শামা কবির ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, এ এলাকায় ১৯৮৮ সালের পর এ রকম পানি দেখল এলাকাবাসী।

শুভ সমরাটজাতীয়
গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল শনিবার প্রায় সবগুলোর নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়েকটির পানি বিপদসীমার উপরে কয়েকটির বিপদসীমার কাছাকাছি ছিল।...