robaet-f_103765.gif
ঢাকায় আমার দেখা সবচেয়ে মনোরম ও সুন্দর সুইমিং পুলটি, বোধ করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সন্ধ্যারাতে সুইমিং পুলের পানিতে ভাসতে ভাসতে ওপরের আকাশ দেখা যায়; ওপরের নীল আকাশে চিল ওড়ে আর নিচের নীল পানিতে আমি ভাসি – এর মধ্যে এক অদ্ভুত ভালোলাগা আর মুগ্ধতা আছে। পুলের নীলাভ ও স্বচ্ছ পানির ডুব-সাঁতার আমাকে সতেজ করে তোলে; ইংরেজিতে যাকে বলে ‘রিজুভেনেইট’ হওয়া। প্রায় সন্ধ্যায় নিয়ম করে সুইমিং পুলে যাওয়ার অভ্যাস আমার অনেক দিনের। দিন কয়েক আগে সেখানে দেখা হলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদ্যসাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগের সঙ্গে। পুলের কোনায় দড়ি দিয়ে স্কিপিং করছে। অন্যান্য নেতার মতো রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা-তদরির বাদ দিয়ে জিম-সুইমিংয়ের প্রতি সাবেক ছাত্রনেতার এমন আগ্রহ দেখে ভালো লাগল। আগে থেকেই সোহাগকে আমি অল্পবিস্তর চিনি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও তুমুল জনপ্রিয় শিক্ষক এবং দেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকসহ অন্যান্য শিক্ষকের ওপর ছাত্রলীগের ন্যক্কারজনক হামলা এখন সব জায়গায় আলোচিত হচ্ছে। ছাত্রলীগে গুণ্ডা, মস্তান, চাঁদাবাজের অভাব নেই- এটা জানা কথা; এর বিপরীতে সোহাগ বেশ ভদ্র আর নিম্নকণ্ঠের। ইতিপূর্বে আরটিভিতে ‘টকশো’ সঞ্চালনের সময় ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে সোহাগ ‘আলোচক’ হিসেবে আসায় তার সঙ্গে টুকটাক কথা হয়েছে। সেদিন সুইমিং পুলে সোহাগ বলল, ‘স্যার, একটি বিষয় নিয়ে আপনাকে লিখতে হবে’। আমি বললাম, ‘কী নিয়ে লিখব?’ ডেইলি স্টারের রেফারেন্স দিয়ে ও বলল, ভারত থেকে বর্তমানে গরু আমদানির সংকট চলছে; বিষয়টি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী/ভোক্তাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর কিন্তু ইন্টারেস্টিং যে, বিষয়টিকে সোহাগ ইতিবাচকভাবে দেখতে চাইছে এবং এ নিয়ে তার কিছু বিকল্প ভাবনার কথাও আমাকে শোনাল। ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের অগ্রসর পাঠকের কাছে সে বিষয়টিই তুলে ধরছি। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বরাতে আমরা জানতে পারছি, বৈধ পথে বেশ কিছু দিন ধরেই ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ রয়েছে। ভারত সরকার কড়াকড়ি আরোপ করায় সীমান্তে দেশটির হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ’ (আরএসএস)-এর স্বেচ্ছাসেবকরা পাহারা পর্যন্ত বসিয়েছেন। এতে দু-চারটি জায়গা ছাড়া দেশের সব সীমান্ত দিয়ে গরু-মহিষ ও ছাগল আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশ। এ দেশের মানুষের খাবার তালিকায় গোমাংস নিত্য বাহারি ছড়ায়। ফলে বাজারে মাংসের দাম হু হু করে বাড়ছে। চামড়াবাজারও হুমকির মুখে। সবচেযে বেশি সমস্যা হবে সামনের কোরবানি ঈদে। প্রতি বছর এ দেশে প্রায় ৫০ লাখ গরু লাগে; কেবল কোরবানি ঈদেই প্রয়োজন হয় ২৫ লাখ গরুর। এর মধ্যে ভারত থেকে আমদানি করা হয় প্রায় অর্ধেক গরু। এ খাতে লেনদেন হয় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। সরকারি হিসাবে, গেল বছর ভারত থেকে গরু আমদানি হয়েছে ২০ লাখ ৩২ হাজার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশটি থেকে আসে লাখ খানেক গরু, অথচ ফেব্রুয়ারিতে আসে মাত্র ৪৮ হাজার; আর গেল চার মাসে মাত্র ২০ হাজারের মতো গরু বৈধ পথে বাংলাদেশে এসেছে। ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ার পর সীমান্তবর্তী কয়েকটি রুট দিয়ে সামান্য গরু আসছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় খুবই কম। গবাদিপশুর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সীমান্ত এলাকার বাংলাদেশি জনগণ ব্যাপক আর্থিক সমস্যায় পড়েছে; যার প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। বেকার মানুষগুলো চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে জড়িত হয়ে পড়ছে। ফলে সীমান্তে বাড়ছে নানা ধরনের অপকর্ম। যারা এসব অবৈধ কাজে জড়িত হচ্ছে না তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যখানে। গরু-মহিষের ব্যবসা বন্ধ হওয়ায় কেবল সাতক্ষীরা সীমান্তে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। গরু করিডোর করার জন্য গড়ে ওঠা খাটালগুলো খালি পড়ে আছে। (প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট)। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের তৎপরতায় প্রতিনিয়ত যেভাবে বাংলাদেশিরা হতাহত হয় এর প্রায় ৯০ ভাগই হয় গরুকেন্দ্রিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হলে সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনাও কমবে। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সীমান্তে ২৮৮ জনকে গুলি করে মারা হয়েছে। গেল বছর মারা গেছেন ৪০ জন আর চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে বিএসএফের গুলিতে মরেছেন ২০ বাংলাদেশি। যেহেতু ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ তাই দেশটির বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতির কথা মাথায় রেখে তারা গরু রপ্তানি করে না। তবে, প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশে গরুর চাহিদা মেটাতে বহুদিন ধরে এক ধরনের ‘অলিখিত সমঝোতা’র মাধ্যমে অবৈধ পথে গরু আসত; কিন্তু মোদি সরকার অবৈধ পথ বন্ধে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে ভারতের সবচেয়ে কাছের দেশ বাংলাদেশ। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ সেদিন বলছিল, বাংলাদেশ এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আমিষের চাহিদা মেটাতে নিজস্ব পরিকল্পনা নিতে পারে। আর সেটি হলো দেশে প্রচুর শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণী আছে। তাদের সবাইকে চাকরির আওতায় আনা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। বেকার ছেলে-মেয়েদের চাকরির বিকল্প কর্মসংস্থান হতে পারে গরুর খামার বা গরুর ট্রেডিং। সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ১ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা বেকার যুবকদের মাঝে নামমাত্র অথবা বিনাসুদে ঋণ দেয়, কিছুটা প্রশিক্ষণ দেয়, তবে ওই টাকা দিয়ে গবাদিপশুর খামার শুরু করতে পারবে তারা। এতে আমিষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বেকারদের কর্মসংস্থান হবে। হুমকির মুখে পড়া চামড়াশিল্প রক্ষা পাবে ক্ষতির হাত থেকে। ব্যাংক ঋণ ফেরত দেওয়া কিংবা সত্যিকারের বেকার উদ্যোক্তারা ঋণ পাবে কি না – এ নিয়ে কিছুটা সংশয়, কিছুটা ঝুঁকি আছে সত্যিই। তবু সরকারের এ ঝুঁকি নেওয়া উচিত। সরকার যদি এক হলমার্কের জন্য ৪ হাজার কোটি টাকার ঝুঁকি নিতে পারে, তাহলে ৩ কোটি বেকারের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার ঝুঁকি নিতে পারবে না? সোহাগ আমার কাছে এ প্রশ্নও রাখল। আমি তার সঙ্গে একমত। খাদ্যের মতো গবাদিপশুতেও আমরা খুব সহজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি।

সত্যিই তো, আমাদের আছে কয়েক কোটি তরুণ প্রাণ – জীবনে সাফল্য পেতে যে কোনো কষ্টকর আর পরিশ্রমী কাজ করতে যারা সব সময় উন্মুখ। আমরা আর কতকাল গরু, ছাগল, মহিষ আর আমিষের জন্য প্রতিবেশী দেশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকব? ৩ কোটি তরুণ থেকে যদি ৩ লাখ তরুণ খামারিও আমরা তৈরি করতে পারি – আমাদের অর্থনীতির জন্য সেটাও বড় পাওয়া। তরুণরা এনগেইজড্ থাকবে, হতাশায় ভুগবে না, মাদক থেকে দূরে থাকবে – এগুলোরও নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক মূল্য আছে। সবকিছুতেই ঝুঁকি থাকে, এখানেও আছে, কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে সে ঝুঁকি নিতে পারার নামই তো দূরদর্শিতা। বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের কাছে আমরা দ্রুত এ রকম দূরদর্শিতা আশা করছি। সোহাগের এ পরিকল্পনা আমার মনে এক অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি করে। কারণ, যখন সারা দেশে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে একই আদর্শের কর্মীকে চাপাতি দিয়ে কোপাচ্ছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চার সংগঠনের নামে ভিন্নমতের মানুষকে নির্যাতন করছে। চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি, লবিংবাজি ও তদবির বাণিজ্যে মশগুল যে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা, তখন সেই সংগঠনের সদ্যসাবেক সভাপতির কাছে গবাদিপশুর সংকট ও এর সমাধানের কথা শুনে দারুণ আশান্বিত হয়েছি। মনে করা যায়, বদিউজ্জামান সোহাগের মতো পরিকল্পনা নিশ্চয় অন্য কৃষি অর্থনীতিবিদদের মনের মাঝেও লুক্কায়িত আছে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ভারতের প্রতি গোমাংসের জন্য নির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনি সীমান্তে বিএসএফের হাতে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও কমবে। আর দেশে গরুর খামার বেড়ে গেলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খড়, ভুসি, ঘাস ও অন্যান্য শিল্পের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি এ খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে। আর ওই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ লাভ করলে নিশ্চয়ই একদিন আসবে সোনালি দিন, দুধে-ভাতে-মাংসে থাকবে মানুষ।

তুনতুন হাসানমতামত
ঢাকায় আমার দেখা সবচেয়ে মনোরম ও সুন্দর সুইমিং পুলটি, বোধ করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সন্ধ্যারাতে সুইমিং পুলের পানিতে ভাসতে ভাসতে ওপরের আকাশ দেখা যায়; ওপরের নীল আকাশে চিল ওড়ে আর নিচের নীল পানিতে আমি ভাসি - এর মধ্যে এক অদ্ভুত ভালোলাগা আর মুগ্ধতা আছে। পুলের নীলাভ ও স্বচ্ছ পানির ডুব-সাঁতার...