84170_f7
জীবনের আনন্দ এখানে স্পর্শ করে না। সুখের স্মৃতি এখানে গুমরে কাঁদে চার দেয়ালের কুঠুরিতে। সারা দেশ যখন ঈদের ‘আনন্দে মাতোয়ারা তখন তাদের জীবনে ঈদের আনন্দ মানে বেদনাময়। ঈদ উপলক্ষে হয়তো কিছু আয়োজন থাকবে এখানে। কিন্তু সেই আয়োজন বুকের জমানো কষ্টকে লাঘব করতে পারবে না কিছুতেই। সারাবছর যেমন থাকেন তারা ঈদও তাদের কাছে সেই দিনগুলোর একটিই। বিশেষ দিনটিতেও চার দেয়ালের আলো-আঁধারির ছোট্ট কুঠুরিতেই দিন কাটবে তাদের। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’। যা ‘বৃদ্ধাশ্রম’ বা ‘প্রবীণ নিবাস’ বলে পরিচিত। বয়সের ভারে ন্যূব্জ, সমাজের কাছে অপাঙ্‌ক্তেয়, পরিবার, আপনজন থেকে বিতাড়িত, প্রতারিত প্রবীণরা থাকেন এখানে। দুদিন পরেই পবিত্র ঈদুল ফিতর। কিন্তু প্রবীণ সংঘের অনেকেই এদিনটিকে আলাদা করে দেখতে চান না। তাতে কষ্ট বাড়ে। বুকে যন্ত্রণা হয়। তবে কারও কারও কাছে ঈদ স্মৃতি রোমান্থনের দিন। ‘কত সুখের দিনই না গিয়েছে’ এই ভেবে একটি দিনের জন্য পুলকিত হন কেউ কেউ। কিন্তু তাতে নিঃশ্বাস ভারি হয়। যন্ত্রণাই শুধু বাড়ে। আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী ৪৫ জন বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা হতাশা ভরা কণ্ঠে জানান, ঈদ তাদের কাছে বিশেষ কিছু নয়। একসময় হয়তো ছিল। যখন সব ছিল। কিন্তু এখন আর সেসব মনে করতে চান না তারা। অতীত মনে করতে গেলেই তাদের কষ্ট বাড়ে। প্রবীণনিবাসে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা ও প্রবীণদের দেখাশুনা করে এমন দুজনের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকের জন্য ঈদের দিন সেমাইসহ বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া নামাজ ও হালকা বিনোদনেরও আয়োজন করা হবে। কিন্তু সবকিছুর পরেও আপনজনদের জন্য আকুতি তাদের শেষ হয় না। কেউ ছেলেমেয়ে, স্বজনদের জন্য, কেউবা নাতি- নাতনিদের জন্য হা-হুতাশ করেন।
ড. এম আবদুল আওয়াল (৭২)। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। অবসর নিয়ে নির্ভার জীবনযাপন করার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের। কিন্তু বিধিবাম। জীবন যৌবন যাদের কল্যাণে ব্যয় করলেন সেই সন্তান ও স্বজনদের থেকে আজ তিনি দূরে। ভাগ্য তাকে নিয়ে এসেছে প্রবীণ নিবাসে। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলে বিমান বাহিনীর উইং কমান্ডার ছিলেন। আবদুল আওয়ালের দাবি ফ্ল্যাট বাড়ি করার নামে ছেলে তার অর্থ আত্মসাৎ করেছে। সেই থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। অন্য দুই ছেলেমেয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়াতে। নিজ স্ত্রীও মানসিক বিকারগ্রস্ত। এ জন্য অনেকটা বাধ্য হয়েই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার ঠাঁই হয়েছে আগারগাঁওয়ের এই প্রবীণ নিবাসে। ঈদের দিন কি করবেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশেষ কিছু নয়। কারও সঙ্গেই যোগাযোগ নেই। আপনজন কেউ আসার কথা নয়, ভাইয়ের ছেলেরা যদি আসে তাদের সঙ্গে দেখা হবে। আর এখান থেকে কর্তৃপক্ষ যদি বিশেষ কোন খাবার সরবরাহ করে সে খাবার খেয়েই দিন পার করবো। ব্যস এতটুকুই। ঈদ আমার কাছে ব্যতিক্রম কিছু নয়। জীবনে অনেক আনন্দের ঈদ কাটিয়েছি। কিন্তু এসব এখন আর মনে করতে চাই না। কি লাভ মনে করে? হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর কোন মানে আছে?
মাছুমা সিদ্দিকী (৭২)। প্রবীণনিবাসে আছেন প্রায় তিন বছর ধরে। স্বামী সিরাজুল ইসলাম ছিলেন প্রকৌশলী। নিজেও ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন দীর্ঘ দিন। যতদিন স্বামী জীবিত ছিলেন ততদিন জীবনকে অন্যরকম মনে হতো তার। কিন্তু এখন জীবন তার কাছে যন্ত্রণার আরেক নাম। বয়সের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন তিনি। সারা শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অসুখ। কিডনিতে ধরা পড়েছে মারাত্মক রোগ। প্রতি সপ্তাহেই ডায়ালাইসিস করতে হয়। ছেলেমেয়েরা কেউ দেশে, কেউ দেশের বাইরে। তাদের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগও হয় না। ঈদ কেমন কাটবে জিজ্ঞাসা করতেই সত্তরোর্ধ মাছুমা সিদ্দিকী বলেন, এখন আর ঈদ কিসের? সব ছিল। কিন্তু এখন অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি। ঈদের দিন কেউ আসবে কি-না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেউ আসবে কি-না সেটাতো জোর দিয়ে বলতে পারবো না বাবা। তাদেরওতো কাজকর্ম ব্যস্ততা আছে। দুঃখভরা কণ্ঠে মাছুমা সিদ্দিকী বলেন, প্রতি ঈদে গরিব-দুঃখীদের কিছু কাপড় দিতাম। কিন্তু আমি এখন নিঃস্ব। তাই এই ঈদে কাউকে কিছুই দিতে পারিনি। সে জন্য খুব খারাপ লাগছে।
বৃদ্ধা মীরা চৌধুরী (৭৫) প্রবীণ নিবাসে আছেন প্রায় ৪ বছর হলো। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বামী জোসেফ চৌধুরী ছিলেন আইএলও’র (ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন) পরিচালক। নিজেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করে খুলনার একটি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। কিন্তু স্বামী মারা যাবার পরেই অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। ছেলে আমেরিকা থেকে যতটুকু খোঁজখবর নেয়ার দরকার ততটুকুই করে। আপন বলতে আর কেউ নেই। কিন্তু মীরা চৌধুরীর অপেক্ষার প্রহর তাতে ফুরোয় না। এখানে আসার পর থেকেই প্রতি ঈদের দিন সকালেই অপেক্ষায় থাকেন তিনি। এই বুঝি তার প্রিয়জনরা এলো। কিন্তু অপেক্ষাই সার হয় তার। আসে না কেউ। তিনি বলেন, ঈদের দিন এখানে সেমাই, পোলাও এটা সেটা দেয়। ঈদের আনন্দ বলতে এতটুকুই।
৬৬ বছরের বেলায়েত হোসেন প্রবীণ নিবাসে আছেন প্রায় ৯ বছর ধরে। লিবিয়ায় মিনিস্ট্রি অব ইলেকট্রিক থার্মেল বিভাগে চাকরি করেছেন অনেকদিন। ১৯৮৬ সালে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে চাকরি ছেড়ে চলে আসেন বাংলাদেশে। ৪ কন্যার বিয়ে দিয়েছেন। প্রিয়তমা স্ত্রী মোসাম্মৎ কামরুননেসা বেগমের মৃত্যুর পর বেলায়েত হোসেনের ঠাঁই হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে। এতদিন ধরে থাকেন বলেই ঈদ তার কাছে ব্যতিক্রম কিছু নয়। তিনি বলেন, ঈদের দিন এখানকার অনেকের স্বজনরা এটা সেটা নিয়ে আসে। কেউ কেউ ব্যতিক্রমী ভালবাসার আয়োজনে বিশেষ কিছু নিয়ে আসে আমাদের জন্য। তখন দেখতে বড় ভাল লাগে। গভীর হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, ঈদের দিন কেউ আসতেও পারে, আবার নাও আসতে পারে। তাতে কোন দুঃখবোধ নেই আমার। অনেকের অনেক কাজকর্ম আছে। ব্যস্ততা আছে। তবে, দোয়া করি সকলেই ভাল থাকুক। মঙ্গলে থাকুক। ঈদের আনন্দ তাদের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক। বেলায়েত হোসেন বলেন, ঈদের দিন সকালে স্থানীয় মসজিদে ঈদের জামাতে শরিক হবো। এরপর মগবাজারে মেয়ের বাসায় যাওয়ার ইচ্ছা আছে। এছাড়া সারাদিন নামাজ, তসবিহ পড়েই ঈদের দিনটি কেটে যাবে।

হীরা পান্নাপ্রথম পাতা
জীবনের আনন্দ এখানে স্পর্শ করে না। সুখের স্মৃতি এখানে গুমরে কাঁদে চার দেয়ালের কুঠুরিতে। সারা দেশ যখন ঈদের ‘আনন্দে মাতোয়ারা তখন তাদের জীবনে ঈদের আনন্দ মানে বেদনাময়। ঈদ উপলক্ষে হয়তো কিছু আয়োজন থাকবে এখানে। কিন্তু সেই আয়োজন বুকের জমানো কষ্টকে লাঘব করতে পারবে না কিছুতেই। সারাবছর যেমন থাকেন...