untitled-1_163586
ঈদযাত্রা মানেই মহাভোগান্তি, ভয়াবহ দুর্ভোগ। আমাদের নিকট অতীতের অভিজ্ঞতাই এর সাক্ষী। অবশ্য গত দু’বছর মহাসড়ক ও ফেরিঘাটের ভোগান্তির মাত্রা কিছুটা কম ছিল। এ বছরও ঈদযাত্রার দুর্ভোগ কমাতে রাস্তা সংস্কার এবং সবচেয়ে খারাপ রাস্তাগুলোকে যান চলাচলের উপযোগী করতে স্বয়ং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়িয়েছেন। তবে ভাগ্য বিরূপ। এবার অতিমাত্রায় বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের বহু স্থানই নির্বিঘ্নে যান চলাচলের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়নি। এ বছরও হয়তো দুর্ভোগ ঘরমুখো মানুষের পিছু ছাড়বে না। ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে এ চিত্র স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, প্রায় প্রতিটি মহাসড়কেরই কিছু না কিছু অংশ ভাঙাচোরা। কয়েকটি মহাসড়কের বেশির ভাগ অংশ ভালো হলেও ভাঙাচোরা কয়েক কিলোমিটারের কারণে পুরো সড়কেই দুর্ভোগের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অতিবৃষ্টিতে এসব ভাঙন খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। ঢাকা ছেড়ে মহাসড়কের মূল অংশে পেঁৗছার পথগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী সাত দিনে আরও বৃষ্টি হতে পারে। পূর্বাভাস সত্যি হলে ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ থাকবেই।

এ কথা স্বয়ং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও স্বীকার করেছেন। তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেছেন, বৈরী প্রকৃতির কাছে ‘হার’ মানতে হয়েছে। তাই এবার ঈদযাত্রা পুরোপুরি নির্বিঘ্ন হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংস্কারে সন্তুষ্ট নন মন্ত্রী নিজেই। তিনি সমকালকে বলেন, ‘সড়ক সংস্কার করা হলেও বৃষ্টির কারণে টেকসই হচ্ছে না। গতকাল (শনিবার) যে সড়ক ঠিকঠাক করা হয়েছিল, আজকের (রোববার) বৃষ্টিতে তা ধুয়ে গেছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না। এখন আর সময়ও নেই। তাই চেষ্টা করছি, ঈদে সড়ক যেন অন্তত যান চলাচল উপযোগী থাকে। আশা করছি, তা থাকবে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘সংস্কারকাজ সঠিকভাবে হয়নি। এবারের বৃষ্টি আমার জন্য একটি শিক্ষা।

ঢাকা থেকে সাভার এবং গাজীপুরের রাস্তা একই সময়ে সংস্কার করা হয়েছে। গাজীপুরের রাস্তা ভালো আছে। সাভারের রাস্তার ছাল-বাকল পর্যন্ত উঠে গেছে। কোথায় কী মানের কাজ করা হয়েছে, এখন তা বুঝতে পারছি। ঈদের পর এদের ধরব।’

সওজ সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সড়কের সংস্কারে। কিন্তু প্রতিবারই ভোগান্তি হচ্ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল হক ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, সমন্বয়হীনতা ও নিম্নমানের সংস্কারকাজের কারণে এত টাকা ব্যয় করেও সুফল আসেনি। মান নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে টাকার অপচয় হবে, দুর্ভোগ কমবে না।

সওজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের বর্ষায় অতিবৃষ্টিতে সড়ক-মহাসড়কের ১৫ শতাংশ ভেঙেচুরে গেছে। তবে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুযায়ী, প্রায় প্রতিটি মহাসড়কেরই কোনো না কোনো অংশ ভাঙাচোরা। ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ থেকে রংপুর, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুর জেলার অংশ ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ জেলার অংশ ভাঙাচোরা। বান্দরবান, পাবনা, ভোলা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল জেলার সড়কও ভাঙাচোরা। সব মিলিয়ে জাতীয় মহাসড়কের প্রায় এক হাজার কিলোমিটার ভাঙাচোরা। ঈদে এর প্রভাব পড়তে পারে সারাদেশেই। ওবায়দুল কাদের জানান, এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারে ২০০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু টাকার অভাবে সংস্কারকাজ বন্ধ নেই।

ঈদ উপলক্ষে জোড়াতালি দিয়ে এসব সড়ক চলাচল উপযোগী করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ‘বালির বাঁধে’ কাজ হচ্ছে না। দুই-এক দিন যান চলাচলের পর ‘সংস্কার’-এর চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একদিনের বৃষ্টিতেই ধুয়েমুছে যাচ্ছে। মহাসড়ক থেকে উচ্ছেদ করা অবৈধ বাজার আবার ফিরে এসেছে। অবৈধ বাজারও হবে ঈদে ভোগন্তিরর কারণ।

সারাদেশে সওজের আওতাধীন সড়কের দৈর্ঘ্য ২১ হাজার ৩০২ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক তিন হাজার ৮১২ কিলোমিটার। আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈর্ঘ্য চার হাজার ২৪৬ কিলোমিটার। বাকিটা জেলা সড়ক। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ, অর্থাৎ তিন হাজার ১০৮ কিলোমিটার ভাঙাচোরা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৯২ কিলোমিটারের মধ্যে ১৪৩ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। ২০১২ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও ৪৯ কিলোমিটারে কাজ বাকি। যেসব এলাকায় কাজ শেষ হয়েছে, সেখানকার রাস্তার অবস্থা ভালো। তবে যেসব এলাকায় এখনও কাজ চলছে, সাম্প্রতিক সময়ের অতিবর্ষণে সেখানকার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এই ৪৯ কিলোমিটারের কারণে ১৪৩ কিলোমিটারের সুফল পাওয়া যাবে না। ৪৯ কিলোমিটারের কারণে দুর্ভোগ হতে পারে পুরো মহাসড়কে।

ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুয়ায়ী, বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের মিরসরাই, কুমিল্লার চান্দিনাসহ বিভিন্ন এলাকায় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। সীতাকুণ্ড অংশে কার্পেটিং ভেসে গেছে। শুধু বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা নয়, এ সড়কের কারণে কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী যাত্রীদের ভুগতে হবে।

ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়ক: এবার ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুল থেকে রংপুর অংশের ১৫৭ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীত করা হবে। দরপত্র হয়েছে। এ কারণে বড় ধরনের সংস্কারকাজ বন্ধ রয়েছে। সওজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের বর্ষায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক।

রংপুর অফিস জানায়, পুরো মহাসড়কে ১০ হাত অন্তর অন্তর ছোট-বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। রংপুর মডার্ন মোড় থেকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার অংশের এমনই অবস্থা। স্থানীয়রা জানান, খোয়া-বালি ফেলে তিন দফা সংস্কার করা হয়েছে এই বর্ষায়। একদিনের বৃষ্টিতেই ধুয়েমুছে গেছে সংস্কার। সওজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ জেলার ৪২৭ কিলোমিটারের মহাসড়কে ২০৯ কিলোমিটারই ভাঙাচোরা। পাবনার এসপি মিরাজউদ্দিন আহমেদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানিয়েছেন, জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবে পুলিশের তরফ থেকে কয়েক দফা তাগিদ দিলেও সড়ক সংস্কার করেনি সওজ।

ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে প্রবেশের পথ কালিয়াকৈর-চন্দ্রায় ঈদের পাঁচ দিন আগেই যানজট দেখা দিয়েছে। সড়কও বৃষ্টিতে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। গতকালও প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট হয় এ সড়কে। অবশ্য স্থানীয় প্রশাসক মনে করেন, গরুবাহী শত শত ট্রাকের কারণেই এই যানজট।

ঢাকা-দক্ষিণবঙ্গ: ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ফরিদপুরের অংশের অবস্থা বেহাল। এ দুই মহাসড়কের প্রবেশপথ ঢাকা থেকে সাভার অংশের অবস্থা ভালো নয়। গত তিন মাস আগে সংস্কার করা হলেও বৃষ্টিতে রাস্তা ভেঙেচুরে একাকার অবস্থা। গত তিন মাসে এ সড়কে ৪০ লাখ টাকার জরুরি সংস্কারকাজ হলেও তা ভেসে গেছে বৃষ্টির পানিতে। স্থানীয় সড়ক বিভাগ মহাসড়কের সিলকোডের কাজ শেষ করলেও কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে পাথরকুচি আর বিটুমিনের আস্তরণ। ঢাকা থেকে খুলনাগামী হানিফ পরিবহনের চালক সালাম শেখ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, রাস্তার কারণে বিকল হচ্ছে গাড়ি। ঈদে এমন হলে দীর্ঘ যানজট হবে। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ৪৯ কিলোমিটার ও ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙ্গা থেকে রাজবাড়ী রাস্তা মোড় পর্যন্ত ফরিদপুর সড়ক বিভাগের অধীন। সরেজমিনে দেখা যায়, গঙ্গাবর্দী, কানাইপুর বাজার, পরীক্ষিতপুর, মধুখালী রেলগেট, বাজারসংলগ্ন এলাকা ও বাগাট বাজার এলাকার অবস্থা খুব খারাপ। এসব এলাকার সড়কজুড়ে ছোট-বড় গর্ত। ফরিদপুর সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, মহাসড়ক দুটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা হলেও বৃষ্টির কারণে সুফল পাওয়া যায়নি।

ঢাকা-সিলেট: ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা বাইপাস- এ তিন জাতীয় মহাসড়কের ৮৭ কিলোমিটার সওজের নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের অধীন। এ অংশের অবস্থা শোচনীয়। সর্বত্রই ভাঙাচোরা। গত রমজানে ঈদের আগে গর্তগুলো ইট-বালুতে ভরাট করা হলেও সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে ভেসে গেছে। সওজ সার্কেলের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সোহেল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, ২০০৩ সালের পর মহাসড়কে আর কোনো ভারী সংস্কারকাজ করা হয়নি। যাত্রাবাড়ী থেকে মেঘনা-গোমতী সেতু পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪২ কিলোমিটার, কাঁচপুর থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ২০ কিলোমিটারে কার্পেটিংয়ে উঠে গেছে বৃষ্টিতে। সিলেট বিভাগের চার জেলার যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়তে পারেন এই ২০ কিলোমিটারের কারণে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কাজ গত ৩০ জুন শেষ হওয়ায় কথা ছিল। ময়মনসিংহের ভালুকার কাঁঠালি থেকে হাজিরবাজার পর্যন্ত তিন কিলোমিটারের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ভরাডোবার পর ১১ কিলোমিটার রাস্তা এখনও দুই লেনের। বড় খানাখন্দ বৃষ্টি হয়েছে এ অংশে। ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় যাত্রীরা ভোগান্তি পড়তে পারেন। গত ঈদে ভালুকায় প্রায় আট ঘণ্টা যানজট হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিবিএলকে দায়ী করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, সময়মতো কাজ শেষ না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মহাসড়ক এরই মধ্যে অবৈধ বাজারের দখলে চলে গেছে। ভালুকার সিডস্টোর থেকে গাজীপুরের শ্রীপুর পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার পথে বসেছে আটটি বাজার। এসব বাজারে চার লেন দুই লেনে পরিণত হয়েছে। জৈনা বাজারের মহাসড়ক পরিণত হয়েছে গলিতে। গত ঈদে এসব অবৈধ বাজারের কারণে যানজট হয়। এবারও একই শঙ্কা রয়েছে। তবে মহাসড়কের অবস্থা যা-ই হোক, যত দুর্ভোগই অপেক্ষা করুক, এবার ঈদেও প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার জন্য ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষ ছুটে যাচ্ছেন আপন শেকড়ের ঠিকানায়।

নৃপেন পোদ্দারএক্সক্লুসিভ
ঈদযাত্রা মানেই মহাভোগান্তি, ভয়াবহ দুর্ভোগ। আমাদের নিকট অতীতের অভিজ্ঞতাই এর সাক্ষী। অবশ্য গত দু'বছর মহাসড়ক ও ফেরিঘাটের ভোগান্তির মাত্রা কিছুটা কম ছিল। এ বছরও ঈদযাত্রার দুর্ভোগ কমাতে রাস্তা সংস্কার এবং সবচেয়ে খারাপ রাস্তাগুলোকে যান চলাচলের উপযোগী করতে স্বয়ং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায় রাস্তায় ছুটে বেড়িয়েছেন।...