85076_f1
মাথাপিছু আয় বাড়ছে। বাড়ছে ক্রয়ক্ষমতা। বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা। কমছে দারিদ্র্য। অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও মিলেছে বিশ্বব্যাংকের তরফ থেকে। বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ। বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১০৮০ ডলার, যা ২০১৩ সালে ছিল ১০১০ ডলার। অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৩১০ ডলার। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি মুদ্রার একটি পিঠ। অন্য পিঠের চিত্র মলিন। আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈষম্য। শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট।
বৈষম্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশের কোটিপতির সংখ্যা। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় মিলে দেশে কোটিপতির সংখ্যা ৫৪ হাজার ছাড়িয়েছে। বিগত ৬ বছরে দেশে নতুন কোটিপতি বেড়েছে ৩৫ হাজার। এর মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ে বেড়েছে সাড়ে ২৭ হাজার। বিভিন্ন ব্যাংকে আমানতকারীর অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এই কোটিপতির সংখ্যা বাড়াকেও বৈষম্যের লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, মূলত সম্পদের অসম বণ্টন ও অবৈধ আয়ের উৎসের কারণে আয় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে কোটিপতির অ্যাকাউন্ট বাড়ার অর্থ আমাদের সম্পদ ক্রমেই কিছুসংখ্যক লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। এতে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে। তিনি বলেন, দেশে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সুষম উন্নয়ন হচ্ছে না। আবার উন্নয়ন যা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই শহরকেন্দ্রিক। এ কারণে মুষ্টিমেয় কিছু লোক উন্নয়নের সুফল ভোগ করছেন। এতে নিচের দিকের মানুষ বরাবরই উন্নয়নবঞ্চিত থাকছেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ২০১০ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব এখনও প্রকাশ করা না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়াতে পারে ৩২ শতাংশ। যদি তাই হয়, তাহলে এ সময়ে কমার হার দেখানো হবে ৮ শতাংশ, যা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টির কারণ নেই। এখনও অনেক কিছু করণীয় আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, আয় বাড়ছে, বৈষম্য থেমে আছে, বৈষম্য আরও কমানো উচিত ছিল। তবে আগের তুলনায় মঙ্গা-খরা অনেকটাই কমেছে। এছাড়া, উচ্চ ও নিম্নবিত্তের কিছুটা ব্যবধান রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক আয় বৈষম্য বৃদ্ধি বা হ্রাস পরিমাপ করা যায় যে ‘গিনি সহগ’ (এটি অর্থনৈতিক শাস্ত্রের একটি ঃড়ড়ষ) দ্বারা, তা যদি বাড়তে বাড়তে শূন্য দশমিক পাঁচ-এর কাছাকাছি পৌঁছায় বা অতিক্রম করে তবে তা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক সংকেত। এখন বাংলাদেশে ‘গিনি সহগ’ এই সীমান্তরেখা প্রায় ছুঁতে চলেছে। অথচ বাংলাদেশে জন্মলগ্ন্নকালে অর্থাৎ ১৯৭২ সালে তা ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩২। তার মানে মোট জাতীয় আয় এবং মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেলেও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে ধনবৈষম্য। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, দারিদ্র্য কমেছে, এটা গর্বের বিষয় হলেও সমাজে ধনী-গরিবের মধ্যে আয় বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। যার একটি ফ্ল্যাট ছিল তার ১০টি ফ্ল্যাট হচ্ছে। অথচ গরিবরা ক্রমেই গরিব হচ্ছে। আয়কর ফাঁকি, প্রাকৃতিক সম্পদ দখল, ঋণ পরিশোধ না করা ইত্যাদি অবৈধ কাজের মাধ্যমে বিত্তশালীরা সম্পদের পাহাড় গড়ছে। দারিদ্র্য নিয়ে ভাবতে হলে বৈষম্য কমার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিবিএসের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, খানাপর্যায়ের আয়-ব্যয় জরিপও বলছে, আয়ের বণ্টন আরও অসম হচ্ছে। গ্রামেও বাড়ছে, শহরেও বাড়ছে। রাজধানীতে আরও বেশি করে। গ্রামাঞ্চলে অসমতা মাপার সূচক ১৯৯১ সালের ২৮ শতাংশের তুলনায় বেড়ে ২০১০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশে। শহরে দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে দশমিক ৪৫ শতাংশে। গত দুই দশকে দেশের সমৃদ্ধি বেড়েছে, কিন্তু তার সুফল অনেক বেশি যাচ্ছে ধনিক শ্রেণীর কাছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখন পর্যন্ত ৪ কোটি লোক দরিদ্র। কাজেই আত্মতুষ্টির কারণ নেই। চার মাধ্যমে বৈষম্য তৈরি হয়। আয়, ব্যয়, সম্পদ ও সামাজিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। বৈষম্য ও দরিদ্রতা কমাতে হলে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, করব্যবস্থায় ভারসাম্য বিশেষত ইনডাইরেক্ট নয়, ডাইরেক্ট কর ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হতে হবে। এছাড়া, সামাজিক কর্মকাণ্ডে সমতা, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার আওতায় প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের নিয়ে আসা সর্বোপরি গরিবদের উৎপাদনমুখী কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব নম্বর ৬৮/এল অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সর্বশেষ যে তালিকা দেয়া হয়েছিল, তাতে দেখা যায়, বিশ্বে স্বল্পোন্নত দেশ আছে ৪৮টি। এর মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশে ৩৪টি, এশিয়ায় ৯টি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪টি ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল ও ইয়েমেন। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৯২ কোটি এবং মাথাপিছু গড় আয় ৯২৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ের চেয়ে একটু বেশি। মিয়ানমারের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশ থেকে বেশি। ভুটানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণ। পূর্ব তিমুর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু ওই দেশগুলো এখনও স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়ে গেছে অন্যান্য সূচকে পেছনে পড়ে থাকার কারণে। গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য- মাথাপিছু আয়ের মধ্যে অনেক ফাঁক থাকে। দেশের মোট জাতীয় আয় এবং সে সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়লেই সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ে না। দেশে একজন কোটিপতি তৈরি হলে, তার জন্য এক হাজার মানুষকে গরিব হতে হয়। অর্থনীতির এটাই নিয়ম। সমপ্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাগরে ভাসমান অভিবাসন-প্রত্যাশী মানুষের আহাজারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দারিদ্র্য কত প্রকট, কর্মসংস্থানের কী দুরবস্থা- মানুষ কতটা বেপরোয়া হলে এ রকম ঝুঁকি নেয়। দেশজ উৎপাদন এবং জাতীয় আয়ের হিসাবে নানা রকম ফাঁকফোকর আছে। যে আয় দেখানো হয়, তা ভাগ করে দিলেই সবার পকেটে তা পৌঁছায় না। জাতীয় আয়ের হিসাবটা হয় অন্যভাবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অবস্থা বোঝা যায় না। একদিকে দেশজ উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। শহরে বড় বড় শপিংমল গড়ে উঠেছে। আবার জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উল্লম্ফনের খবর শুনে আহ্লাদিত হওয়ার অবকাশ নেই বলে মনে করেন এ গবেষক।
জানা গেছে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের ৪০ শতাংশের বেশি এখন কোটিপতিদের দখলে। ৫০ ভাগ লাখপতি আর ১০ ভাগ আমানত রয়েছে লাখ টাকার নিচের অ্যাকাউন্টগুলোয়। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কাছে ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছে। এতে ধনী- গরিবের বৈষম্যও বাড়ছে। একটি গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান (একজন কোটিপতি) জানান, অনেকেই নিজ মেধা ও শ্রম দিয়ে আজ উন্নতির শিখরে পৌঁছেছেন, যাদের অনেকেই কোটিপতি। কাজেই কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেই তারা শুধু অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য হয়েছেন, তা কিন্তু নয়। তিনি বলেন, অনেক কোটিপতিই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ সালের মার্চে দেশে ব্যক্তিপর্যায়ে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট ছিল ১২ হাজার ৯১৭টি। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৮৭টিতে। সে হিসাবে গেল ৬ বছরে দেশে ব্যক্তিপর্যায়েই কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৭৭০টি। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০০৯ সালের মার্চে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলে ব্যাংকে কোটি টাকার ঊর্ধ্বে অ্যাকাউন্ট ছিল ১৯ হাজার ৬৩৬টি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৭২৭টি। সে হিসাবে ৬ বছরে দেশে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় মিলে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৮ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি অ্যাকাউন্টধারী ছিলেন মাত্র পাঁচজন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা ৪৭-এ পৌঁছে, যা ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৯৮ জন। তখন তাদের আমানতের পরিমাণ ছিল সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ১০ শতাংশ। এরপর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩-এ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতির মোট সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৪ এবং ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কোটিপতির মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬২। এরপর অক্টোবর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছিল ৮ হাজার ৮৮৭ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরে বেড়েছিল ৫ হাজার ১১৪।

ওয়াজ কুরুনীজাতীয়
মাথাপিছু আয় বাড়ছে। বাড়ছে ক্রয়ক্ষমতা। বাড়ছে কোটিপতির সংখ্যা। কমছে দারিদ্র্য। অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও মিলেছে বিশ্বব্যাংকের তরফ থেকে। বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ। বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১০৮০ ডলার, যা ২০১৩ সালে ছিল ১০১০ ডলার। অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু...