85663_f1
রাজনীতির নিষ্ঠুর থাবা থেকে রেহাই পায়নি মায়ের পেটের শিশুটিও। মায়ের পেটেই গুলিতে আহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীর আলোতে আসতে হয়েছে তাকে। বুধবার এই নবজাতকের বয়স হয়েছে মাত্র সাত দিন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ২০৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে তার। গতকাল তার কচি কোমল শরীরে অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। শিশুটি ক’দিন থেকেই কান্না করছে। নড়াচড়া করছে। চিকিৎসকরা আশাবাদী শিশুটি বাঁচবে। কিন্তু শঙ্কিত তার স্বজনরা। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে হতদরিদ্র এই পরিবার। প্রতিদিন বাইরে থেকে ওষুধ ও স্যালাইন কিনতে হচ্ছে তাদের। এভাবে আর কতদিন পারবেন তারা। বিপদগ্রস্ত এই পরিবারের পাশে যেন কেউ নেই। এ ঘটনার দায়েরকৃত মামলার মূল আসামিদের এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো মামলা তুলে নিতে শিশুর পিতা বাচ্চু ভূঁইয়াকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে।
ঢামেক হাসপাতালের ছোট্ট বিছানায় শুয়ে আছে শিশুটি। তোয়ালে দিয়ে ঢাকা তার শরীর। স্যালাইন দেয়া হচ্ছে তাকে। কখনও কখনও কৃত্রিম উপায়ে দুধ পান করানো হচ্ছে। তার বিছানার পাশে নেবুলাইজার। মঙ্গলবার পর্যন্ত এটি ব্যবহার করা হয়েছে। এখন শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা নেই। তবু যদি প্রয়োজন হয় তাই পাশে রাখা হয়েছে এটি। হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে নয় সদস্যের চিকিৎসক কমিটির তত্ত্বাবধানে চলছে তার চিকিৎসা। যে কচি শরীরে আদর করার কথা ছিলো তার মা-বাবার। সেই শরীর বিদ্ধ হয়েছে গুলিতে। নবজাতক এই শিশুর শরীরে দিতে হয়েছে ১৮টি সেলাই। শিশুটির পিঠ দিয়ে গুলি ঢুকে বুক ও হাতে আঘাত করে বাম চোখ দিয়ে বের হয়ে গেছে। মঙ্গলবার দুই চোখ খুলেছিলো সে। বুধবার অস্ত্রোপচারের পর বাম চোখটি বন্ধ, চোখটি খুলতে পারছিলো না শিশুটি। চোখটি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা রেখেই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তবে গুলির কারণে চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি-না এ বিষয়ে নিশ্চিত নন তারা। শিশুটিকে রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের জন্য রক্ত নেয়া হচ্ছিলো তার। নরম শরীরে সুঁই ঢুকতেই শব্দ করে কান্না করছিলো সে। পরক্ষণেই আবার শান্ত। বিছানায় নীরব শিশুটি। গুলির আঘাতে কালো হয়ে আছে বাম চোখ। শিশুর মুখটি দেখে অনেকেই ঘৃণা প্রকাশ করছিলেন সন্ত্রাসীদের প্রতি। যাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি গর্ভবতী নারী ও তার অনাগত সন্তান। নির্মমতার শিকার এই শিশুর পাশে থাকতে পারেননি তার পিতা-মাতা। শিশুটির মা গুলিবিদ্ধ নাজমা বেগম মাগুরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা নাজমা বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে মাগুরায় আছেন শিশুর পিতা বাচ্চু ভূঁইয়া। স্বজনদের মধ্যে দুই ফুফু শিখা ও শিউলি বেগম রয়েছেন শিশুর পাশে। কথা হয় তাদের সঙ্গে। শিখা জানান, এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। শিশুর পিতা বাচ্চু ভূঁইয়া একজন হতদরিদ্র মানুষ। চা বিক্রি করে সংসার চালান তিনি। তার দুটি সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে শরীরের ঘাম ঝরাতে হয় তাকে। এরমধ্যেই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে তার স্ত্রী-সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শিখা বলেন, সরকার দলের সন্ত্রাসীরা গুলি করেছে অথচ আজ পর্যন্ত সরকারের কেউ তাদের পাশে দাঁড়াননি। এই নবজাতকের খোঁজখবর নেননি। মাগুরার পুলিশ সুপার ২০ হাজার টাকা হাতে দিয়ে নবজাতককে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ও কয়েকদিনে তা শেষ হয়ে গেছে। ঋণ করে টাকা আনতে হচ্ছে এখন। স্যালাইনসহ বিভিন্ন ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে তাদের। ওদিকে শিশুর মা নাজমা বেগম সঙ্কটাপন্ন থাকায় তার বাবা ঢাকায় আসতে পারছেন না। এছাড়াও সেখানে দুটি সন্তান রয়েছে। শিখা বলেন, সন্ত্রাসীদের মনে কোন দয়ামায়া নেই। গুলি করার আগে শিশুর মা নাজমা ঘরের বারান্দায় ছিলেন। সন্ত্রাসীরা যখন তাকে গুলি করতে উদ্যত হয় তখন ওই সন্ত্রাসীদের নাম ধরে তিনি বলেছিলেন, আমি গর্ভবতী মহিলা, আমাকে গুলি করো না তোমরা। তখন সন্ত্রাসীরা বলেছে গর্ভবতী বলে কোন ছাড় নেই। বলেই গুলিবর্ষণ করে। গত বৃহস্পতিবার বিকালে মাগুরা সদরের কারিগরপাড়ায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয় অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম। এ ঘটনায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় মাগুরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয় মেয়ে শিশুটির। পরবর্তীতে রোববার শিশুটিকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঢামেক হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান আশরাফুল হক ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, শিশুটি বাঁচবে বলেই আশাবাদী তারা। শিশুটি এখন স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। কান্নাকাটি করছে। চোখ খোলে তাকানোর চেষ্টা করছে। তবে অপরিণত হয়ে জন্ম হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৫০০ গ্রাম ওজন কম শিশুটির। যে কারণে একটা ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে বলে জানান তিনি। শিশুর স্বজনরা জানান, তার মা নাজমা ৩৪ সপ্তাহের গর্ভবতী ছিলেন। সেই হিসাবে ছয় সপ্তাহ আগে জন্মেছে শিশুটি।
তবে গুলিবিদ্ধ এই শিশুটিই তার মাকে রক্ষা করেছে বলে জানিয়েছেন মাগুরা হাসপাতালের চিকিৎসক শফিউর রহমান। বুধবার সন্ধ্যায় তিনি জানান, শিশুটির মা এখন আশঙ্কামুক্ত। গর্ভে থাকা শিশুটি ছিলো তার মায়ের জন্য আশীর্বাদ। শিশুটি পেটে না থাকলে গুলির আঘাতে মায়ের মারা যাওয়ার শঙ্কা থাকতো। গুলিটি শিশুটির শরীর ভেদ করেছে। যে কারণে মায়ের খাদ্যনালী ও নাড়িভুঁড়ির বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। শিশুটিই মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আমাদের মাগুরা প্রতিনিধি জানান, এ ঘটনার পর পুলিশ সুমন হোসেন ও সোবাহান নামে দুইজনকে ফরিদপুর থেকে গ্রেপ্তার করলেও বুধবার পর্যন্ত মূল আসামিদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। গুলিবিদ্ধ নাজমার স্বামী বাচ্চু ভূঁইয়া ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, বৃহস্পতিবার বন্দুকযুদ্ধের পর পুলিশ ৭২ ঘণ্টার সময় চেয়ে নিয়েছে। এখন পর্যন্ত তারা মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। যে কারণে আসামিরা নিরাপদ স্থানে থেকে আমাকে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে মাগুরা সদর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে অপরিণত শিশুর কথা ভেবে ভেবে শঙ্কার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন মা নাজমা বেগম। সন্তানটিকে একটিবার দেখতে না পারার জন্য আক্ষেপ জানিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ক্ষত-বিক্ষত সন্তানের ব্যথায় কাতর নাজমা বেগম অপরাধীদের কঠিন শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের গুলি আমার সন্তানের শরীরের চারটি স্থানে আঘাত করেছে। আমিও চাই ওইসব সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করা হোক।
বৃহস্পতিবার প্রকাশ্য দিবালোকে বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে প্রসূতি নাজমা বেগম ছাড়াও আহত হয় একই এলাকার বাসিন্দা আবদুল মমিন (৬০) এবং মিরাজ হোসেন (৩০)। শুক্রবার গভীর রাতে মারাত্মক জখম আবদুল মমিনের মৃত্যু হলে পরদিন তার ছেলে রুবেল হোসেন জেলা যুবলীগ কর্মী আজিবর, মোহাম্মদ আলী, জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সেন সুমনসহ ১৬ জনকে আসামি করে মাগুরা থানায় একটি মামলা দায়ের করে। এ মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে সুমন হোসেন ও সোবাহান নামে স্থানীয় দুই যুবককে পুলিশ গ্রেপ্তারের পর ৭ দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করলেও এখন পর্যন্ত তাদের রিমান্ড শুনানি হয়নি। তবে আগামী রোববার রিমান্ড শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাগুরা গোয়েন্দা শাখার ওসি ইমামুল হক। তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, আমরা অপরাপর আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে ইতিমধ্যে আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ পেলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাবে।

তাহসিনা সুলতানাশেষের পাতা
রাজনীতির নিষ্ঠুর থাবা থেকে রেহাই পায়নি মায়ের পেটের শিশুটিও। মায়ের পেটেই গুলিতে আহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই পৃথিবীর আলোতে আসতে হয়েছে তাকে। বুধবার এই নবজাতকের বয়স হয়েছে মাত্র সাত দিন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ২০৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে তার। গতকাল তার কচি কোমল শরীরে অস্ত্রোপচার করতে...