1438360102
পাশাপাশি দুটি চেয়ার। সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে, নানা কর্মসূচিতে। একই হাতলে হাত রেখে অধিকাংশ সময়ই বসে থাকেন এরশাদ-রওশন দম্পতি। কথা বলেন, সিদ্ধান্ত নেন। শুধু ভাঙতে পারেন না মাঝখানে গড়ে ওঠা দলীয় দেয়াল। যেটির নিয়ন্ত্রণ দুজনেরই বাইরে।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। তার পতœী বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ এখন যোজন-যোজন দূরে। নিজ থেকে নয়, কান কথা আর বেনামে উড়ো বক্তব্যই তাদের এ দূরত্ব সৃষ্টি করেছে বলে দাবি দলীয় লোকজনের। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এই দম্পতি দলে ঘাপটি মেরে থাকা একটি বলয়ে বন্দি বলেও মনে করেন তারা। চক্রটির ক্রীড়নক একজন হলেও তার অনুগত কয়েকজন নেতা এরশাদ-রওশনের গা-ঘেঁষা হিসেবে কাজ করে নানা কুমতলব বাস্তবায়ন করছেন বলে অভিযোগ তাদের।
জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলতে গিয়ে নারীদের শো-পিসের সঙ্গে তুলনা করেন এরশাদ। স্বামীর এ বক্তব্যের জন্য সংসদে দুঃখ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন। বিষয়টি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু এর কয়েকদিন পর এরশাদ সংসদে দাঁড়িয়ে তার জন্য ক্ষমা চাওয়ায় রওশনের ব্যাপক সমালোচনা করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলের মহাসচিব এরশাদকে রওশনের বিরুদ্ধে পুনরায় এই বক্তব্য দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এরশাদের এই বক্তব্যে খুবই মনোক্ষুণœ হন রওশন।
৯০-এর আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর একাকী হয়ে পড়েন এরশাদ। দীর্ঘ ৬ বছর কারাগারে থাকা অবস্থায় একমাত্র সঙ্গী হিসেবে সবসময় প্রেরণা যুগিয়ে গেছেন রওশন। এ সময় তিনি এরশাদ মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বও দেন। বন্দি থাকা অবস্থায় এরশাদের নির্বাচনের কাজটিও রওশন নিজে করেছেন। দলীয় দায়িত্বে না থেকেও দলের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এরশাদ-রওশনের এই সম্পর্ক ভাঙতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল দাম্পত্য জীবনে কলহের সৃষ্টি করে ফায়দা লুটছে।
এরশাদ-রওশনের সম্পর্কে চিড় ধরানো নেতাদের দালাল চক্রের সঙ্গে তুলনা করে জাতীয় পার্টি প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন ক্ষুব্ধ নেতা অভিযোগ করে বলেন, কান কথা শুনে শুনে এরশাদ-রওশন এখন দিগি¦দিক ঘুরপাক খাচ্ছেন। তারা জানান, এই চক্রের বাইরে বের হওয়ার শক্তি বা সাহস কোনোটিই নেই এরশাদের। তিনি এখন জি হুকুম। আর দলের পূর্ণ ক্ষমতার ছড়ি ঘুরানোর দায়িত্ব দিয়েছেন দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুকে। পার্টির চেয়ারম্যানের এই নির্বুদ্ধিতা, উদাসীনতা আর প্রকৃত নেতাদের দূরে ঠেলে দেওয়ায় এরশাদ এখন কর্মীহীন নেতা। এভাবে চলতে থাকলে এরশাদ-রওশন দম্পতিকে একদিন তারা রাজ্যহীন রাজা বানিয়ে ছাড়বে বলেও মন্তব্য তাদের।
এই কুচক্রি মহলে কারা কারা জড়িত জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, ইশারাই কাফি। এটা স্পষ্টতই যে জাতীয় পার্টি এখন নানা চক্রে বিভক্ত। একটি চক্র তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে পার্টির চেয়ারম্যানকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন। ত্যাগী নেতাকর্মীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। চেয়ারম্যানকে দিয়ে অনেককে বহিষ্কারও করাচ্ছেন। লক্ষ্য একটাই, দলকে নিঃশেষ করা। আক্ষেপ করে কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, একটা সময় ছিল যখন মানুষ জাতীয় পার্টিকে বিকল্প ভাবত। এখন সেখান থেকে সরে এসেছে। পার্টি প্রধানের নীরবতা, গুটিকয়েক নেতার বলয়কেন্দ্রিক কর্মকা- যা সাধারণ নেতাকর্মীদের হতাশ করছে। এই চক্রমুক্ত না হলে জাতীয় পার্টির উঠে আসা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
ক্ষুব্ধ মনোভাব ব্যক্ত করে এক সময়ের ডাকসাইটে নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম প্রকাশ না করে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, জাতীয় পার্টি হাইজ্যাক হয়েছে। দালালের খপ্পরে পড়ে দলটি এখন সমুদ্রে ভাসছে। তারা এরশাদ-রওশনকে ভয় দেখিয়ে পরস্পরের থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। জাতীয় পার্টিকে জনবিচ্ছিন্ন করে এই চক্রটি এরশাদের কাছে মুক্তিপণ আদায় করছে। যখন-তখন যাকে ইচ্ছা তাকে দল থেকে বহিষ্কার করাচ্ছে। সরকারের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে এরশাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
আক্ষেপ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, আপনি কি সত্যি করে বলতে পারবেন আমি জাতীয় পার্টিতে আছি কিনা? আমার মতো অন্যান্য প্রেসিডিয়াম সদস্য যাদের দলের কোনো কর্মসূচিতে ডাকা হয় না তারা কি দলে আছে? দল তো এখন উড়ে এসে জুড়ে বসা এমপি-মন্ত্রীরা চালাচ্ছেন। আমাদের অপরাধ এরশাদের কথা মতো নির্বাচন থেকে সরে এসেছিলাম। আমাদের অপরাধ আমরা প্রকৃত জাতীয় পার্টি করি। আমাদের অপরাধ জাতীয় পার্টি ছাড়া আর কারও সঙ্গে লিয়াজোঁ করি না।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় পার্টিতে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু মহাসচিব নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই দলে বিভাজন সৃষ্টি হয়। তিনি শুরু থেকেই তার কয়েকজন আস্থাভাজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে একটি বলয় সৃষ্টি করেন। তাদের নিয়েই তিনি দলীয় নানা পরামর্শ দিয়ে দেন এরশাদকে। এতে দলের অন্য নেতারা ছিটকে পড়েন। কেউ নতুন করে বলয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। সব মিলে জাতীয় পার্টিতে এখন তিনটি সক্রিয় গ্রুপ কাজ করছে।
অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জাতীয় পার্টি সূত্রে জানা যায়, পার্টির মহাসচিব দলের শীর্ষ নেতাদের উপেক্ষা করায় নেতাদের মধ্যে বিভাজন বাড়ছে। অনেকে দল ত্যাগ করছেন। দলে মূল্যায়িত না হওয়ায় এমনটি হচ্ছে। এরই মধ্যে জাতীয় পার্টির শীর্ষ নেতা জিএম কাদের, রওশন এরশাদ ও তার সমর্থক সংসদ সদস্য ও সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার ও তার সমর্থক গোষ্ঠী জিয়াউদ্দিন বাবলুর ওপর ক্ষুব্ধ আছেন। পার্টির নাজুক অবস্থার জন্য বাবলুকে দায়ী করে এ নিয়ে আলোচনাও করেছেন তারা। দলের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে একের পর এক সমালোচনা করেছেন জিএম কাদের। এরশাদ-রওশনকে বলয়মুক্ত হওয়ার আহ্বান ও পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরের এই ভূমিকায় অনেকেই তার পক্ষ নিয়েছেন। তাকে নিয়ে ‘জাতীয় পার্টি বাঁচাও’ নামে একটি বলয় কাজ করছে। জিএম কাদেরের এ অংশে দলের সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, এরশাদের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা ববি হাজ্জাজসহ অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতা রয়েছেন। আরেকটি বলয় রয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদকে ঘিরে। এখানে দলের অধিকাংশ এমপি রয়েছেন।
এ বিষয়ে জিএম কাদের ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, জাতীয় পার্টি ও তার নেতাদের এখন সঠিক চরিত্র বলে কোনো কথা নেই। এটা ঠিক না হলে একটি পার্টি চলতে পারে না। সাধারণ মানুষও তা গ্রহণ করে না। জাতীয় পার্টিতে সঠিক রাজনীতির অভাব রয়েছে জানিয়ে কাদের বলেন, আমাদের প্রকৃত জাতীয় পার্টি করা দরকার। দলে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের শনাক্ত করা দরকার। দেশের সাধারণ মানুষ এখনো জাতীয় পার্টিকে চায়। তবে আমাদের আদর্শ ঠিক করতে হবে। আমরা বিরোধী দলে থাকব, নাকি সরকারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাবÑ জনগণ এখন সেটিই জানতে চায়।

বাহাদুর বেপারীজাতীয়
পাশাপাশি দুটি চেয়ার। সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে, নানা কর্মসূচিতে। একই হাতলে হাত রেখে অধিকাংশ সময়ই বসে থাকেন এরশাদ-রওশন দম্পতি। কথা বলেন, সিদ্ধান্ত নেন। শুধু ভাঙতে পারেন না মাঝখানে গড়ে ওঠা দলীয় দেয়াল। যেটির নিয়ন্ত্রণ দুজনেরই বাইরে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। তার পতœী বিরোধীদলীয় নেতা...