86840_x3
পাকিস্তানের সাবির মাসিহ। বংশপরম্পরায় জল্লাদ তিনি। সাবিরের পুর্বপুরুষের পেশা এটি। কয়েক প্রজন্ম ধরে এ কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জল্লাদ সাবির মাসিহ’র জীবনধারা। প্রতিবেদনে জল্লাদগিরিকে আখ্যা দেয়া হয়েছে সাবিরের পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর পাকিস্তানের ৭ বছরের স্থগিতাবস্থা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। এর পরের দিনই সাবির মাসিহ’র লাহোরের বাড়ির চারপাশে ভিড় জমাতে থাকে পাপারাজ্জিরা। বেশ খুশি মনেই সেদিন মৃত্যুদণ্ডের পুনরারম্ভের বিষয়ে নিজের মতামত জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ততক্ষণে তার দেরি হয়ে যাচ্ছিল। সাবির বলেন, ১৮ই ডিসেম্বর সন্ধ্যার মধ্যেই আমাকে ফয়সালাবাদে পৌঁছতে বলা হয়েছিল। কেননা, পরের দিন খুব ভোরে ২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয় আমাকে। তাই খুব ছোট ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড় ঢুকিয়ে প্রস্তুত হতে শুরু করেন সাবির। এরপর চেহারা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে টিভি সাংবাদিকদের অজান্তে তাদের নাকের ডগা দিয়েই ফয়সালাবাদগামী বাস ধরতে চলে যান স্থানীয় বাস-স্টপেজে। ঠিক এ সময় তার বাড়ি থেকে ১৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে ফয়সালাবাদের নিরাপত্তারক্ষীরা বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। শহরের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জেলা কারাগারে। কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির কোন মঞ্চ নেই বলেই এ ব্যবস্থা। এরা সাধারণ কোন আসামি ছিল না। এদের একজন ছিল মোহাম্মদ আকিল ওরফে ডা. ওসমান। তিনি ২০০৯ সালে রাওয়ালপিণ্ডিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে দুঃসাহসী এক হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সে হামলায় ২০ জন মানুষ নিহত হয়েছিল। অপর আসামি আরশাদ মেহমুদ ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফকে হত্যা চেষ্টার জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাদের উভয়ের মধ্যে মিল হলো- তারা দুজনই ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য। ছিলেন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্যও। এদিকে ফয়সালাবাদ যেতে বেশ কয়েকবার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর তল্লাশির মুখে নিজের জল্লাদ হিসেবে পাওয়া আইডি কার্ড দেখাতে হয়েছে সাবিরকে। জঙ্গিরা প্রতিশোধ নিতে হামলা চালাতে পারে আশঙ্কায় ব্যাপক নিরাপত্তা গ্রহণ করা হয়েছিল সেদিন। এর পরেরদিনই সাত বছরের মধ্যে পাকিস্তানে প্রথম ফাঁসি দণ্ড কার্যকর করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আকিল ও আরশাদ। তাদের উভয়েরই ফাঁসি কার্যকর করেছিলেন জল্লাদ সাবির মাসিহ। বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে পাকিস্তানে। বিশ্বের কোথাও এমন নজির নেই। শুধুমাত্র গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই এখন পর্যন্ত দেশটিতে ২০০ জন ফাঁসির দণ্ড পেয়েছে। এদের কেউ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালানোর দায়ে, কেউবা খুনের দায়ে অভিযুক্ত। আবার দণ্ডপ্রাপ্তদের কারও কারও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার ২৩ বছর বয়সী শাফকাত হুসেনকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে এক শিশুকে হত্যার দায়ে। এ অপরাধের দায় স্বীকার করেনি শাফকাত। তার আইনজীবীদের শেষ যুক্তি ছিল, যে শিশুকে হত্যার দায়ে শাফকাতকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, সে ঘটনার সময় শাফকাত ছিল কিশোর। পাকিস্তানের আইনে কিশোর বয়সী কাউকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায় না। তার আইনজীবীদের আরও যুক্তি ছিল, শাফকাতকে কারাগারে নির্যাতন করে পুলিশ ওই শিশুকে হত্যার দায় স্বীকার করতে বাধ্য করে। ফাঁসির ওপর স্থগিতাবস্থা প্রত্যাহারের পর পাঞ্জাব প্রদেশেরই ৬টিরও বেশি কারাগারে প্রায় ৬০ জন লোকের গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করেছেন সাবির মাসিহ। তবে তিনি করাচিতে ফাঁসি হওয়া শাফকাত হুসেনের বেলায় জড়িত ছিলেন না। তার বিশ্বাস, ২০০৭ সালের পর থেকে দুই শতাধিক ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করেছেন তিনি। কোন অনুশোচনা ছাড়াই নির্দ্বিধায় এ কথা বলে ফেললেন সাবির। কণ্ঠে ছিল না এতটুকু জড়তা। এর কারণ হয়তো- তিনি এসেছেন এমন এক পরিবার থেকে যারা বংশপরম্পরায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করে এসেছে। অর্থাৎ তিনি পারিবারিকভাবেই একজন জল্লাদ। ঠিক বৃটেনের পিয়েরেপয়েন্টস, ফ্রান্সের স্যানসন্স বা ভারতের মাম্মু জল্লাদের পরিবারের মতো।
বৃটিশ রাজের সময় থেকেই উপমহাদেশের বেশির ভাগ জল্লাদ ছিল খ্রিষ্টান। ব্যতিক্রম নন সাবির নিজেও। তার বংশগত নাম মাসিহ। এটি যিশুখ্রিষ্টের অপর নাম। উপমহাদেশের খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে এ নামটি বেশ প্রচলিত। খুবই সরু ও কোঠরে ঢুকে যাওয়া চোখের অধিকারী সাবির। তামাক চিবাতে চিবাতে দাঁতের রং হলদেটে হয়ে গেছে। কথা বলার সময় তোতলে যান বারবার। কিন্তু গায়ে একবিন্দু চর্বি নেই। ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার সাবিরের চেহারায়ও কেমন যেন একটা ছাপ আছে। তিনি বলেন, ফাঁসি দেয়া আমার পারিবারিক পেশা। আমার বাবা ছিলেন একজন জল্লাদ। আমার পিতামহ ও প্রপিতামহও ছিলেন জল্লাদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোমপানির সময়কাল থেকেই তারা এ কাজ শুরু করেন। তবে তার পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে ‘বিখ্যাত’ বোধ হয় তার দাদার ভাই তারা মাসিহ। তিনি ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর ফাঁসি কার্যকর করেন। কিন্তু সাবিরের পিতা সাদিক মাসিহ একজন জনপ্রিয় নেতাকে হত্যার কাজটি করতে চাননি বলেই তার চাচা তারা মাসিহ’র কপাল খুলে যায়। সাবির আরও জানান, তার দাদা কালা মাসিহ ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন বিখ্যাত সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী ভগত সিং-কে। ভগত সিং ১৯৩১ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক ছিলেন। তবে ভারতের মাম্মু জল্লাদের পরিবারের দাবি, মাম্মুর দাদা রাম রাখাই ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন ভগত সিং-কে।
প্রায় ২০০ জন আসামির ফাঁসি কার্যকর করেছেন সাবির। কিন্তু এ নিয়ে তার কোন অনুভূতিই নেই। অনুশোচনা তো আরও দূরের কথা। তাকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেন, ফাঁসি দেয়ার আগের রাত কি আপনি ঘুমাতে পারেন? বা ফাঁসির পর আপনি কি দুঃস্বপ্ন দেখেন? আপনি প্রথম যেদিন কাউকে ফাঁসি দিয়েছিলেন, তখন আপনি কেমন বোধ করেছিলেন? আপনার পরিবার ও বন্ধুরা আপনার চাকরিটিকে কীভাবে দেখেন? সব কিছুর জবাব সাবিরের একটিই- আমি কিছুই বোধ করি না। এটা আমার কাছে পারিবারিক কাজের মতো। আমার পিতা আমাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে কাজটি করতে হবে। তিনি এমনকি নিজে ফাঁসি দেয়ার সময় আমাকে চাক্ষুষ দেখাতে নিয়ে যেতেন। তার প্রথম একক ফাঁসি দেয়ার ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের জুলাইয়ে। তার ভাষ্য, সেদিন একমাত্র যে জিনিসটি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়, তা হলো, আসামির দড়ি ঠিকভাবে পরানো। কিন্তু কারাগারের উপ-প্রধান আমাকে জানান দুশ্চিন্তা না করার জন্য। তিনি কয়েকবার দড়ি লাগিয়ে ও খুলে দেখান, যাতে করে আমি শিখি। এরপর যখন কারাগারের জেলার আমাকে লিভার টেনে দেয়ার ইঙ্গিত দেন, আমি সেদিকেই মনোযোগ দিই। ফাঁসির আসামি যখন নিচে ঝুলে পড়ে, সেদিকে আমি তাকাইনি। এখনও কম-বেশি এমনই। প্রথমে ফাঁসির আসামিকে তার অপরাধের সাজা পড়ে শোনানো হয়। তাকে গোসল করানো হয়। এ ছাড়া চাইলে প্রার্থনা করার জন্যও বলা হয়। এরপরই তাকে নিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে রওনা দেয় কারারক্ষীরা। সাবির বলেন, আমার একমাত্র চিন্তা হলো, আসামিকে শেষ তিন মিনিটের মধ্যে প্রস্তুত করা। আমি তার জুতা খুলে দিই ও তার মুখে কালো মুখোশ পরাই। তার হাত-পা বাঁধি। এরপর ফাঁসের দড়ি তার গলায় লাগাই। নিশ্চিত করতে হয়, তার বাঁ কানের নিচে যাতে দড়িটা পড়ে। এরপর লিভার টেনে দিতে জেলারের নির্দেশের অপেক্ষা করি। ফাঁসি দেয়ার আগে বা পরে জল্লাদদের কোন মানসিক কাউন্সেলিং করানো হয় না। এ ছাড়া চাকরি শেষ হবার আগে কতো জনকে তার ফাঁসি দিতে হবে, তার কোন সীমাবদ্ধতা নেই।

তুনতুন হাসানএক্সক্লুসিভ
পাকিস্তানের সাবির মাসিহ। বংশপরম্পরায় জল্লাদ তিনি। সাবিরের পুর্বপুরুষের পেশা এটি। কয়েক প্রজন্ম ধরে এ কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জল্লাদ সাবির মাসিহ’র জীবনধারা। প্রতিবেদনে জল্লাদগিরিকে আখ্যা দেয়া হয়েছে সাবিরের পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর পাকিস্তানের ৭ বছরের স্থগিতাবস্থা...