1_97291
ঘটনা এক. নাটোরে কাজ শেষ না করেই এলজিইডির ১৭টি প্রকল্পের পুরো টাকাই তুলে নেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ না করলেও অর্থবছর শেষ হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ঠিকাদারদেরও বিল পরিশোধ করা হয়ে গেছে।

ঘটনা দুই. লক্ষ্মীপুরে টিআর, কাবিখা, কাবিটা, ভিজিএফ, কর্মসৃজন প্রকল্পের ১০ ভাগও বাস্তবায়ন হয়নি। এসব প্রকল্প সম্পর্কে সাধারণ মানুষও কিছু জানে না।

ঘটনা তিন. হবিগঞ্জে নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প দিয়ে বরাদ্দের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। বাছ-বিচার না করেই লুটে নেওয়া হয় রাস্তাঘাট ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ। নাটোর, লক্ষ্মীপুর আর হবিগঞ্জের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটের এ চিত্র এখন সারা দেশের। বিভিন্ন নামের নানা প্রকল্পের খাদ্য ও টাকা রীতিমতো হরিলুট হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প হয়, সে প্রকল্পের নামে অর্থ ও খাদ্যশস্য বরাদ্দ হয়, কিন্তু প্রকল্প আর বাস্তবায়ন হয় না। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ লুটপাটের মহোৎসব শুরু হয় জেলায় জেলায়। জানা গেছে, কোনো কোনো জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে পুরো টাকাই উত্তোলন করে নেওয়ার নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। এ বিল উত্তোলনে সহযোগিতা করেছেন পিআইও অফিসের অসাধু কর্মকর্তারা। বিনিময়ে তারা পেয়েছেন প্রকল্পের মোট অর্থের ২০ শতাংশ কমিশন। কোনো জেলায় ৩০ ভাগ, কোথাও ৭০ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। আবার কোনো জেলার মানুষ জানেই না এসব প্রকল্পের খবর। গোপনেই লুটপাট করে নেওয়া হচ্ছে বরাদ্দের বিপুল অঙ্কের অর্থ। একইভাবে হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখিয়ে টাকা লোপাট করা হয়েছে। একই পরিস্থিতি এলজিইডির প্রকল্পে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলজিইডিতে ৬০ শতাংশ অর্থের কাজ হয়। বাকি ৪০ শতাংশ চলে যায় ঘুষে। অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি অর্থবছর বিভিন্ন জেলায় কাবিখা ও টিআর (সাধারণ ও বিশেষ) প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ এলেও অসময়ে কাজ শুরু করায় এখন পর্যন্ত অস্তিত্বহীন রয়েছে অধিকাংশ প্রকল্প। কোনো কোনো জেলায় পুরোপুরি বাস্তবায়িত প্রকল্পের নাম-নিশানাও নেই। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বও নেই, অথচ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে টিআর ও কাবিখার চাল-গম। যথারীতি তা হরিলুটও হয়ে গেছে। টিআর, কাবিখা, কাবিটার গম-চাল আত্মসাতের আমলনামায় দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩-১৪ ও ২০১৫ অর্থবছরে সরকার জাতীয় উন্নয়ন ও জনস্বার্থে কিশোরগঞ্জ, বগুড়া, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ ১২ জেলায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের মোট ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩০ টন গম-চাল বরাদ্দ দেয়। প্রকল্পের কাজ না করেই এসব আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে জানা যায়, প্রকল্পের অর্থের অর্ধেক গেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের পকেটে। কাবিখার চাল-গমও দেদার বিক্রি হয়েছে কালোবাজারে। অনেক সময় দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরে হরিলুট : লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর জেলায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা, ভিজিএফ, কর্মসৃজন প্রকল্প নিয়ে চলছে হরিলুট কারবার। প্রকল্পের টাকা, গম আর সোলার প্যানেলের টাকা অধিকাংশই গেছে এমপি সমর্থক ও দলীয় নেতা-কর্মীদের পকেটে। প্রকল্পগুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) অরনেন্দ্র কিশোর চক্রবর্তী ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা (পিআইও) বেসামাল। তাদের যোগসাজশে এসব প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই কর্মকর্তারা কয়েক বছর ধরে এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসন এসব প্রকল্পের ভাগবাটোয়ারার অংশ পেয়েছেন। জেলার চার সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে এসব বরাদ্দের একই অবস্থা বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের চারটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ২০১৪-১৫ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য ৩০ লাখ করে ১ কোটি ২০ লাখ, টিআর প্রকল্পে প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে ৬০ লাখ করে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং প্রত্যেক সংসদ সদস্যের জন্য সোলার প্যানেল স্থাপন ও উন্নয়নকাজে ১৪৬ টন করে ৫৮৪ টন গম বরাদ্দ হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে এসব টাকা ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। জেলায় ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে ১ হাজার ১০০-এর বেশি কার্ড নামে-বেনামে ইস্যু করে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

সদর উপজেলার শাকচর, টুমচর, চররুহিতা, লাহারকান্দি, উত্তর জয়পুর, বাঙ্গাখাঁ, দিঘলী ইউনিয়ন ঘুরে প্রকল্পগুলোর একটিতেও তথ্যসংবলিত কোনো সাইনবোর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী জানান, প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অবহিত নন। তারা শুনেছেন এমপির সমর্থক, আত্মীয়স্বজন ও দলীয় লোকজন কিছু বরাদ্দ পেয়েছেন কিন্তু কীসের বরাদ্দ তা তারা জানেন না। এ ক্ষেত্রেও প্রকল্প সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে ২০ পার্সেন্ট হারে ক্যাশ টাকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা (পিআইও) তাদের চেক দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব প্রকল্পের ১০ ভাগ কাজও বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান। তারা কখনো প্রকল্প দেখভালের দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তাকেও মাঠে দেখেননি। সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অফিসে বসে পার্সেন্টেজ আদায় করে কোনোরকম তদারকি ছাড়াই চেক ইস্যু করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা। তা ছাড়া বহু এলাকায় প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের ৫০ ভাগ টাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা হাতিয়ে নিয়ে বিল পাস করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোরে কাজ শেষ না করে ১৭টি প্রকল্পের সব টাকাই তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থবছর শেষ হয়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে সবটুকু কাজ শেষ না হলেও ঠিকাদারের পাওনা বিলের সব টাকা পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে। নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা এলজিইডি অফিস ও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এডিপির ১৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

হীরা পান্নাঅপরাধের ডায়েরী থেকে
ঘটনা এক. নাটোরে কাজ শেষ না করেই এলজিইডির ১৭টি প্রকল্পের পুরো টাকাই তুলে নেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ না করলেও অর্থবছর শেষ হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে ঠিকাদারদেরও বিল পরিশোধ করা হয়ে গেছে। ঘটনা দুই. লক্ষ্মীপুরে টিআর, কাবিখা, কাবিটা, ভিজিএফ, কর্মসৃজন প্রকল্পের ১০ ভাগও বাস্তবায়ন হয়নি। এসব প্রকল্প সম্পর্কে...