বিশেষ প্রতিবেদক ।

রাখাইন থেকে ১৩ বছর বয়সী রোজিনা আক্তার তার ফুফু দিলারা বেগমের সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। কুতুপালং অনিবন্ধিত শিবিরের বি-থ্রি ব্লকে তারা থাকার জায়গা পান। মাসখানেক আগে একদিন ত্রাণের জন্য ঘর থেকে বের হয় রোজিনা। কিন্তু তারপর আর ঘরে ফেরেনি সে। খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

রোজিনার ফুফু দিলারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানিয়েছেন, নিখোঁজের কয়েকদিন পর পাশের ঘরের একজনের মোবাইলে ফোন করে কান্নাকাটি করছিল রোজিনা। বলেছে- সে না চিনে এক লোকের সাথে কথা বলে। ওই লোক তাকে কোথায় নিয়ে গেছে জানে না। এখন সে ঢাকায় আছে। যাদের সাথে আছে তারা তাকে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না, ক্যাম্পে ফিরতে চাওয়ায় তারা তাকে মারধর করছে।

কুতুপালং বি-থ্রি ব্লকে আগে থেকে থাকতো রোহিঙ্গা কিশোর মোহাম্মদ রিফাত। সেও গত প্রায় দুই মাস ধরে নিখোঁজ। তার বাবা ছালেহ আহমদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে   জানান, একদিন মাদ্রাসায় যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয় রিফাত। পরে আর ঘরে ফেরেনি। পরে মাদ্রাসায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, সে সেখানে যায়নি। এখনো তার কোনো খোঁজ নেই।

রোজিনা ও রিফাতের মতো এরকম অনেক রোহিঙ্গা শিশু, কিশোর-কিশোরীর উপর দৃষ্টি পড়েছে মানব পাচারকারীদের। এসব শিশু নিখোঁজ হওয়ার কথা বলা হলেও আদতে তারা মানব পাচারকারীদের নানা ধরনের ফাঁদে পা দিয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে তথ্য মিলছে। পাচারের ঘটনাগুলো মাঝে-মধ্যে শরণার্থী শিবির কর্তৃপক্ষের নজরেও আসে। কিন্তু নিখোঁজ শিশু-কিশোরদের অভিভাবকরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে না যাওয়ায় তাদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা, আইওএম বলছে, গত ২৫ আগস্টের পর ক্যাম্প থেকে নিখোঁজের বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় সেসব যাচাই- বাচাই করে দেখা হচ্ছে। যদিও এখনো পর্যন্ত ঠিক কতজন পাচারের শিকার হয়েছে সেই তথ্য নেই সংস্থাটির কাছে।  নানামুখী চাপে থাকা রোহিঙ্গাদের আইন-কানুন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় পাচারের বিষয়ে তারা প্রতিকার পাওয়ার জন্য আইন-শৃংখলা বাহিনীর কাছে যায় না বলে মনে করে আইওএম।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা আইওএম’র মুখপাত্র হালা জাবের বলছিলেন, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শিশু-কিশোরদের  নিখোঁজ হওয়ার হার বেড়ে গেছে বলে আমরা শুনেছি। কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগও পেয়েছি। এই ধরনের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাইও হচ্ছে। এই বিষয়ে এখনি সবার দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার বলে মনে করছেন জাবের।

যদিও বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ক্যাম্প থেকে নিখোঁজ কিংবা পাচারের ঘটনা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত থানায় অভিযোগ করা হয়নি, আর অভিযোগ পাওয়া না গেলে তেমন কিছু করার থাকে না।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানিয়েছেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে কোনো শিশু, নারী কিংবা অল্প বয়সী কিশোরী নিখোঁজের অভিযোগ আসেনি। রোহিঙ্গা শিবিরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের অতিরিক্ত ফোর্স নিয়োগ করা হয়েছে। র্যাব, সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে সরাসরি কোনো অভিযোগ আমরা এখনো পাইনি।’

কুতুপালং নিবন্ধিত ক্যাম্পের ইনচার্জ রেজাউল করিম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানিয়েছেন, ইতিপূর্বে পাচারের কয়েকটি ঘটনার সাথে ক্যাম্পে বসবাসকারী কয়েকজন রোহিঙ্গার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। অনিবন্ধিত ক্যাম্পগুলোতে সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ না থাকায় সেখানে পাচারকারীদের তত্পরতা বেশি, যা নিবন্ধিত ক্যাম্পে নেই। রোহিঙ্গারা নিজেরাই এসব ঘটনায় জড়িত। ইতিপূর্বে দুজনের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রমাণও পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশি কেউ সরাসরি এসবে জড়িত না।

কুতুপালং, থ্যাইংখালীসহ বেশ কিছু ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখনো বেশ কিছু পরিবারে ৮/১০ বছরের শিশু, বিভিন্ন বয়সের কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার খবর আছে। তবে মাঝে-মধ্যে দু’-একজন ফিরে আসায় বাকিরা কী নিখোঁজ, নাকি পাচার হয়েছে এখনই তা বলা যাচ্ছে না। পরিবারগুলো তার সন্তানের অপেক্ষায় এখনো দিন গুনছে।

যে কারণে পাচার হচ্ছে রোহিঙ্গারা : কুতুপালং ক্যাম্পের ইনচার্জ রেজাউল করিম এ বিষয়ে  ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, প্রথমত রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগ অংশ আর্থিক দৈন্যতায় থাকায় তাদের তাদের লোভ দেখিয়ে সহজে পাচার করা যায়। রোহিঙ্গাদের হাত ধরে অতি সহজে এসব পাচারের ঘটনা ঘটছে।

আইওএম এর মুখপাত্র হালা জাবের বলছিলেন, রোহিঙ্গা শিশু, কিশোর, কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্করা নানা কারণেই পাচার হচ্ছে। কেউ অর্থের লোভে, কেউ কাজ পাওয়ার আশায় পাচার হচ্ছে। তাদের পরিবারই তাদের এই পথে যেতে উত্সাহ দিচ্ছে।

উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান,  উখিয়া-টেকনাফের ১২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা দৈনিক হাজার টনেরও অধিক জ্বালানি কাঠ পোড়াচ্ছে। রোহিঙ্গারা বনভূমিতে বসবাসের পাশাপশি সরকারি, সামাজিক বনায়ন ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগানের ফলদ ও বনজ গাছ কেটে তৈরি করছে ঘর-বাড়ি। এছাড়া যে আড়াই হাজার বনভূমিতে রোহিঙ্গারা অবস্থান করছে, সেখানে সামাজিক বনায়ন রয়েছে প্রায় আড়াইশ’ একর। যা ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকা। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল এরশাদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন ‘রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। রোহিঙ্গারা পার্শ্ববর্তী বন থেকেই জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছে। ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশের উপর। কক্সবাজার বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (দক্ষিণ) আলী কবির ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে   বলেন রোহিঙ্গারা যেভাবে বনের গাছপালা উজাড় করছে এভাবে চলতে থাকলে কক্সবাজারে আর সবুজ থাকবে না।

খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2017/11/117.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2017/11/117-300x300.jpgতালুকদার বাবুলএক্সক্লুসিভ
বিশেষ প্রতিবেদক । রাখাইন থেকে ১৩ বছর বয়সী রোজিনা আক্তার তার ফুফু দিলারা বেগমের সাথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। কুতুপালং অনিবন্ধিত শিবিরের বি-থ্রি ব্লকে তারা থাকার জায়গা পান। মাসখানেক আগে একদিন ত্রাণের জন্য ঘর থেকে বের হয় রোজিনা। কিন্তু তারপর আর ঘরে ফেরেনি সে। খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের। রোজিনার ফুফু দিলারা ক্রাইম...