89386_f1
সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘রানা প্লাজার’ প্রদর্শনী ও সম্প্রচারে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওই চলচ্চিত্রের জন্য সেন্সরবোর্ডের দেয়া ছাড়পত্রের কার্যকারিতাও ওই সময় পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। বিচারপতি নাঈমা হায়দার এবং বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ আদেশ দেয়। ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনির দায়ের করা একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ আদেশ দেয়। রিট আবেদনটির পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এবং ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান। অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের পাশাপাশি রুলও জারি করেছে হাইকোর্ট। রুলে রানা প্লাজা চলচ্চিত্রের সেন্সর বোর্ডের দেয়া সনদ কেন বাতিল করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তথ্য সচিব, চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং চলচ্চিত্রটির প্রযোজককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনা অবলম্বনে রানা প্লাজা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক নজরুল ইসলাম খান। তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, রানা প্লাজা ধস এবং ১৭ দিন পর উদ্ধার হওয়া রেশমাকে নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। রেশমার উদ্ধার হওয়ার ঘটনা সে সময় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। তাই রেশমা চরিত্রটিই আমাদের সিনেমার মূল চরিত্র। নজরুল ইসলাম খান বলেন, জনসচেতনতা তৈরি করার জন্যই আমরা চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছি। এতে দেশ বা গার্মেন্টস শিল্পের কোন ধরনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়নি।
নজরুল ইসলাম খানের কাহিনী, চিত্রনাট্য এবং মুজতবা সউদের লেখা সংলাপ নিয়ে নির্মিত রানা প্লাজা ছবির কাহিনী এগোয় দুই তরুণ-তরুণীর প্রেম, ভালবাসা ও বিয়েকে ঘিরে। সাইমন ও পরীমনি প্রেম করে বিয়ে করে চলে আসে ঢাকায়। এসে একটি বস্তিতে ওঠে। সাইমন সিএনজি চালায়। এক সময় স্থানীয় মাস্তানদের সঙ্গে মারামারিতে সাইমনের পা ভেঙে গেলে পরীমনি সংসার চালানোর জন্য একটি গার্মেন্টে কাজ নেয়। একদিন ঘটে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার ১৭ দিন পর জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় পরীমনিকে। ছবিতে পরীমনি রেশমা চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
উল্লেখ্য, নতুন প্রযোজনা সংস্থা এমএ মাল্টি মিডিয়া হাউজ প্রযোজিত ও পরিবেশিত ‘রানা প্লাজা’ ছবির মহরত ২০১৩ সালের ১লা অক্টোবর বিএফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাব প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত হয়। মহরতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি, বর্তমানে লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সরওয়ার্দি। ২০১৪ সালের ১৪ই জুন ছবিটি ছাড়পত্রের জন্য চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডে জমা দেয়া হলে সেন্সর বোর্ড ছবিটির ছাড়পত্র প্রদানে আপত্তি জানায়। পরবর্তীতে ছবির প্রযোজক শামীম আকতার সেন্সর বোর্ডের আপিল বিভাগে আবেদন করলে আপিল বিভাগও সেন্সর বোর্ডের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর প্রযোজক উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। উচ্চ আদালত ‘ভয়ঙ্কর ও হিংসাত্মক’ দৃশ্য নিরীক্ষা করে সিনেমাটিকে ছাড়পত্র দিতে নির্দেশ দেন বলে জানান সেন্সর বোর্ডের সচিব মুন্সী জালাল উদ্দিন। পরে সেন্সর বোর্ড ১৬ই জুলাই সনদপত্র প্রদান করে। তবে রিট আবেদনকারী ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান চৌধুরীর দাবি, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দৃশ্য বাদ দেয়া হয়নি। সনদপত্র পাওয়ার পর প্রযোজনা সংস্থা এমএ মাল্টি মিডিয়া আগামী ৪ঠা সেপ্টেম্বর ছবিটি মুক্তি দেয়ার জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি থেকে অনুমোদন নিয়ে মুক্তির জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কিন্তু পুনরায় আদালতের নির্দেশে ছবির মুক্তি স্থগিত হয়ে যায়। ‘রানা প্লাজা ছবিটির প্রদর্শনীতে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে রিট আবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৭ সালের ফিল্ম সেন্সরশিপ অনুযায়ী চলচ্চিত্রে কোন ভীতিকর দৃশ্য প্রদর্শন বা দেখানো যাবে না। কিন্তু এই সিনেমায় বিভিন্ন ভীতিকর দৃশ্য রয়েছে।
যেভাবে শুরু রানা প্লাজার
সাভারের ‘রানা প্লাজা’ ট্র্যাজেডি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলো। তখনই পরিচালক নজরুল ইসলাম খান এই ট্র্যাজেডি নিয়ে ছবি নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। একদিন এই স্বপ্নের কথা জানান এমএ মাল্টিমিডিয়া হাউজের কর্ণধারকে। গল্প শুনে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। নজরুল ইসলাম খান সংলাপ লেখার দায়িত্ব দেন সাংবাদিক, কাহিনীকার মুজতবা সউদকে। এ প্রসঙ্গে সংলাপ লেখক মুজতবা সউদ বলেন, একটি সত্য ঘটনাকে উপজীব্য করে কাল্পনিক কিছু চরিত্র সৃষ্টি করে ‘রানা প্লাজা’ ছবির গল্প দাঁড় করানো হয়। ছবিটি মূলত একটি মিষ্টি প্রেমের গল্প। গল্পের এক পর্যায়ে রেশমা সংসার চালানোর জন্য গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। তারা যে বস্তিতে থাকে সেই বস্তির অনেকেই এই গার্মেন্টসে কাজ করে। তারাই রেশমাকে রানা প্লাজায় নিয়ে যায়। এবং একদিন বিপর্যয়টা ঘটে। মুসতবা সউদ বলেন, বিপর্যয়ের ঘটনাটিতো আর মিথ্যা নয়। সারাবিশ্ব বিষয়টি সরাসরি দেখেছে। সিনেমায় সেটাই দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্ক থাকার বিষয়টি ছবিতে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কোন অসৎ উদ্দেশ্য এখানে কাজ করেনি। একজন সংলাপ লেখক হিসেবে আমি সততার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করেছি।
যেভাবে পরীমনি রেশমা হলেন-
‘রানা প্লাজা’ ছবির চিত্রনাট্য সম্পন্ন হওয়ার পর পরিচালক নজরুল ইসলাম খান ও সংলাপ লেখক মুজতবা সউদ কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীকে নিয়ে বসলেন, গল্প শুনে এক শুভাকাঙ্ক্ষী জানতে চাইলেন রেশমা চরিত্রে কাকে ভাবছেন? পরিচালক একজন নায়িকার নাম বললেন। বিতর্কিত সেই নায়িকার নাম শুনে শুভাকাঙ্ক্ষী পরামর্শ দিলেন ‘পরীমনি’কে নেয়ার। পরীমনি সবেমাত্র সিনেমায় এসেছেন। নতুন পরিচালক শাহ আলম মণ্ডল পরিচালিত ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ ছবিতে অভিনয় করছেন জায়েদ খানের সঙ্গে। ফেসবুকে পরীমনি ছবি দেখেই শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শ এবং সেই সঙ্গে যুক্তি দেন যে, রেশমা চরিত্রে পরীমনির মতো একজন নতুন এবং সুন্দরী নায়িকা হলে ভালো হয়। পরিচালক নজরুল ইসলাম খান পরামর্শটা লুফে নিলেন। পরদিন যোগাযোগ করলেন পরীমনির সঙ্গে। ইস্কাটনের কেএফসিতে পরীমনির সঙ্গে বসলেন পরিচালক এবং নির্বাহী প্রযোজক। প্রথম দেখাতেই পছন্দ এবং রেশমা চরিত্রে চুক্তিবদ্ধ করানো হলো পরীমনিকে। মুহূর্তের মধ্যে আলোচনায় চলে আসেন পরীমনি।
রানা প্লাজা আমার জীবনে একটাই-
‘রানা প্লাজা’ যখন সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়ে মুক্তির জন্য চূড়ান্ত হয় তখন ছবির প্রযোজনা সংস্থা এমএ মাল্টিমিডিয়া এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেই সংবাদ সম্মেলনে পরীমনি আবেগআপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমার হাজারো ছবি মুক্তি পেলেও ‘রানা প্লাজা’ আমার জীবনে একটাই। তিনি বলেন, রেশমা ১৭ দিন আটকে ছিল ধ্বংসস্তূপের নিচে আর আমি সেন্সর বোর্ডে। এরপর তিনি আর কোন কথা বলতে পারলেন না। বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
এটা আমার জন্য দুর্ভাগ্যের
‘রানা প্লাজা’ ছবির নায়ক সাইমন। সম্প্রতি ‘ব্ল্যাকমানি’ ছবির সাফল্যে দারুণ উজ্জীবিত এই নায়কও অধীর আগ্রহে দিন গুনছিলেন ‘রানা প্লাজা’ মুক্তির। কিন্তু হঠাৎ এই সংবাদ শুনে অত্যন্ত বিমর্ষ কণ্ঠে সাইমন বলেন, এটা আমার জন্য দুর্ভাগ্যের। অনেক আশা ছিলো ছবিটি নিয়ে। আশা এখনো আছে। কিন্তু বড় একটা সাফল্য পিছিয়ে গেছে। হয়তো একদিন ছবিটি মুক্তি পাবে, সফলও হবে। কিন্তু এখন খুব খারাপ লাগছে।
রানা প্লাজা নিয়ে প্রদর্শকদের মধ্যে ছিল দারুণ আগ্রহ
‘রানা প্লাজা’ ছবিটি মুক্তি নিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শকদের মধ্যে ছিল দারুণ আগ্রহ। ছবিটি দর্শক মন জয় করবে- এমন সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে প্রেক্ষাগৃহের মালিক এবং তাদের প্রতিনিধি বুকিং এজেন্টরা ছবির পরিবেশনা সংস্থায় প্রতিদিন ভিড় জমাতেন। লোভনীয় অঙ্কের অফার দিয়ে নিজেদের প্রেক্ষাগৃহের জন্য ছবিটি নিশ্চিত করতেন। কিন্তু হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পর রানা প্লাজার প্রযোজনা পরিবেশনা সংস্থা এমএ মাল্টিমিডিয়া হাউজে থমথমে অবস্থা। সেখানকার সবার চোখে-মুখে অনিশ্চতার ছাপ। শেষ মুহূর্তে এসে ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যেও বিপর্যয় নেমে এসেছে।
আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সমাধান করা হবে
‘রানা প্লাজা’ ছবির নির্বাহী প্রযোজক সৌমিক হাসান সোহাগ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, বিষয়টি যেহেতু আইনের। সেহেতু আইনি প্রক্রিয়ায় এর সমাধানের চেষ্টা করা হবে। আমাদের আইনজীবী বিষয়টি দেখছেন। এর বাইরে আমাদের আপাতত আর কিছুই বলার নেই।

নৃপেন পোদ্দারবিনোদন
সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘রানা প্লাজার’ প্রদর্শনী ও সম্প্রচারে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। ওই চলচ্চিত্রের জন্য সেন্সরবোর্ডের দেয়া ছাড়পত্রের কার্যকারিতাও ওই সময় পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। বিচারপতি নাঈমা হায়দার এবং বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ আদেশ দেয়। ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ...