07_268050
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার পশ্চিম চরপোড়াগাছার কৃষক ইসমাইল হোসেন আউশ ধান চাষ করেছিলেন এক একর জমিতে। বন্যায় সেই ধানক্ষেত ডুবে গিয়েছিল। পানি সরে যাওয়ার পর তিনি পুরো জমিতে মাত্র তিন মণ ধান পেয়েছেন। অথচ ওই এক একর জমিতে চাষ দিতেই তাঁর খরচ হয়েছিল আড়াই হাজার টাকা। এর বাইরে বীজ, শ্রমের মজুরি ও সারের খরচ তো আছেই।

অনেক এলাকায় বরং ধান পুরোপুরি ডুবে যাওয়ায়ই লাভ হয়েছে কৃষকের! বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ধান কাটতে যে খরচ হতো তা বিক্রি করে উঠত না। তাই নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর শীলমুদ গ্রামের কৃষক রহমতউল্লাহ তাঁর ধান কাটেননি। ডুবে যাওয়া জমিতে ভেসে ভেসে সেই ধান খেয়ে নিয়েছে হাঁসেরা।

রামগতির চরপোড়াগাছা আইসিএম ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তাঁর গ্রামে একজন কৃষি শ্রমিক চার বোঝা ধান কাটার জন্য মজুরি নেন ২৫০ টাকা। নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ওই চার বোঝায় এবার ৩০-৩৫ কেজির বেশি ধান পাওয়া যায়নি। ওই পরিমাণ ধান বাজারে ২২০ টাকার বেশি দরে বিক্রি করা যায়নি। যার ক্ষতি বেশি হয়েছে তিনি কাটার খরচের ভয়ে ধানই কাটেননি।

একই রকম অবস্থা দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলার। আউশ ধান পাকার আগে ওইসব জেলা অতিবৃষ্টির কবলে পড়ে। ফলে পানির নিচে ডুবে যায় ফসলি জমি। অনেক এলাকায় প্রথম দফার পানি নেমে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফা বন্যার কবলে পড়ে। ফলে আউশ ধান আবাদ করে অনেক কৃষক কিছুই পায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যানুযায়ী এ মৌসুমে ১১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ২৪ লাখ ২৮ হাজার টন আউশ চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। আউশ মৌসুমের জন্য ৩০ কোটি ২১ লাখ টাকার প্রণোদনাও দিয়েছিল সরকার, যা পেয়েছেন দুই লাখ ১০ হাজার কৃষক। এ বছর বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলায় আউশ ধানের বেশি ক্ষতি হয়েছে।

গত মৌসুমে দেশে ১০ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ২৮ হাজার টন আউশ চাল হয়েছিল। এবার ক্ষতি হলেও দেশে মোট চালের সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়বে না। গত বোরোতে ভালো ফলন হওয়ায় এবং কিছু চাল আমদানির কারণে বাজারে দাম এখন খুবই কম। মোটা চাল খুচরা বাজারেও ৩০ টাকা কেজি দরে মিলছে। একই চাল মিলপর্যায়ে ২৫-২৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বন্যায় কৃষকরা ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এখন বেশির ভাগ জেলায় আউশ কাটা শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ডিএই। কৃষকরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানায়, আউশ ধান কাটার শুরুর দিকেই বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক বৃষ্টি হয়। ফলে তড়িঘড়ি করে কেটে অনেকে ধান ঘরে আনলেও শুকানো যায়নি। বাজারে ভেজা ধান ৩৫০-৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হয়েছে। আর যেসব ধানের মান খারাপ তা বিক্রি করতে হয়েছে আরো কম দরে। অবশ্য গত কয়েক দিনে দাম বেড়েছে।

গত বছর দেশে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল সেপ্টেম্বরে। ফলে ওই মাসের শেষ দিকে কিছু জেলায় বন্যা হয়েছিল। তবে এবার জুলাই ও আগস্ট মাসে দুই দফায় বন্যার কবলে পড়েছে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অনেক জেলা। ফলে ক্ষতির পরিমাণও বেশি হয়েছে ওইসব জেলায়। অবশ্য অনেক এলাকার চিত্র ভিন্ন। যেসব এলাকায় শেষ দিকে ভালো বৃষ্টি হয়েছে এবং যেসব জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়নি সেখানে ভালো ফলন হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে শেষ দিকে ভালো বৃষ্টি পেয়ে আউশের ফলন ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষকরা।

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার পশ্চিম চরপোড়াগাছার ইসমাইল হোসেন ছাড়াও মনসুর আহমেদ, হেলাল উদ্দিন, আবদুর রহমান চৌকিদারসহ অনেক কৃষকেরই আউশ ধান নষ্ট হয়ে গেছে বন্যায়। কেউ কেউ কিছুই পায়নি। কেউ কেউ সামান্য কিছু ধান পেলেও বাজারে সেই ধানের দর মিলেছে খুবই কম।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির শীলমুদ গ্রামের কৃষক রহমত উল্লাহ ১২ গণ্ডা (৭২ শতাংশ) জমিতে আউশ ধান আবাদ করেছিলেন। পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। যেটুকু ধান পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল তাও হাঁসে খেয়ে ফেলেছে। তিনি জানান, পুরো জমি আবাদ করতে তাঁর খরচ হয়েছিল আট হাজার টাকার মতো। বন্যা না হলে সেখান থেকে ৩০-৩৫ মণ ধান পাওয়া যেত। এখন এক টাকাও পাওয়ার আশা নেই। রহমত উল্লাহ আরো ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তাঁর গ্রামের জালাল আহমেদ, আবদুল হাই কামাল, আবু তায়েব মাস্টারসহ কয়েকজন আউশ ধান আবাদ করেছিলেন। সবার ধানই কমবেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিছু উঁচু জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর এখন আবার পোকা আক্রমণ করেছে।

অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা, জলাবদ্ধতাসহ অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় গৃহীত কার্যক্রম ও করণীয় পর্যালোচনার জন্য গঠিত দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস জাতীয় প্ল্যাটফরমের সভায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক হিসাব উপস্থাপন করা হয় গত ৩ সেপ্টেম্বর। ওই হিসাবে দেখা যায়, বন্যায় ৯৩ হাজার ৪০৪ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ২৫১ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ৯০৫ টাকা।

তবে উত্তরের বিভিন্ন জেলায় শেষ দিকে ভালো বৃষ্টি হওয়ায় আউশ ধান ভালো হয়েছে বলে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানিয়েছে কৃষকরা। রংপুরের পীরগঞ্জের কৃষক মোতালেব আলী জানান, প্রথমে বৃষ্টি কম হলেও পরে ভালো বৃষ্টি হওয়ায় আউশ ধান ভালো হয়েছে। তবে তাঁর চার বিঘা জমির আমন ফসল তলিয়ে যায়। এর মধ্যে আড়াই বিঘা জমির আমন ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

শুভ সমরাটপ্রথম পাতা
লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার পশ্চিম চরপোড়াগাছার কৃষক ইসমাইল হোসেন আউশ ধান চাষ করেছিলেন এক একর জমিতে। বন্যায় সেই ধানক্ষেত ডুবে গিয়েছিল। পানি সরে যাওয়ার পর তিনি পুরো জমিতে মাত্র তিন মণ ধান পেয়েছেন। অথচ ওই এক একর জমিতে চাষ দিতেই তাঁর খরচ হয়েছিল আড়াই হাজার টাকা। এর বাইরে বীজ, শ্রমের...