91598_33
লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। এ নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও অশান্তি। দফায় দফায় এভাবে দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রকাশ করেছেন তীব্র অসন্তোষ। বেশ কিছু নিত্যপণ্যের মূল্য গত সপ্তাহের চেয়ে এ সপ্তহে ১০-১২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসবকিছুর সঙ্গে থেমে নেই অতিপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পিয়াজ ও কাঁচামরিচের দামও। জুলাই মাসে যে পিয়াজের দাম ছিল ৩৫-৪০ টাকা, সেই পিয়াজ প্রতি কেজি কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা। পিয়াজের সঙ্গে ওতপ্রতভাবে জড়িত যে পণ্যটি সেটি হলো কাঁচামরিচ। সেই কাঁচামরিচের দাম এখন আকাশছোঁয়া। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা দরে। এ বিষয়ে একটি মিডিয়া হাউসে কর্মরত সায়মা আলী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, আমার তরকারিতে আগে শুধু কাঁচামরিচই দেখা যেত আর এখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খোঁজলেও একটা কাঁচামরিচ পাওয়া যাবে না। তেজগাঁও মহিলা কলেজের ইসলামের ইতিহাসের লেকচারার নাসরিন সুলতানা বলেন, দুই মাস ধরে কাঁচামরিচ আর পিয়াজের কাছেও যায়নি। আগে যা কেনা ছিল সেগুলো দিয়েই কোন রকম দিন পার করছি। প্রাইভেট ব্যাংকে কর্মরত এক ক্রেতাকে দ্রব্যমূলের কথা বলতেই ক্ষেপে ওঠে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, আমাদের কথা শুনে আর কী করবেন, দাম তো এক টাকাও কমাতে পারবেন না। সারা পৃথিবীতে কোথাও দ্রব্যের দাম এত বেশি না বলে জানান তিনি। গতকাল রাজধানীর পলাশীবাজার, হাতিরপুল কাঁচাবাজার, নিউ মার্কেট কাঁচাবাজার ও কাওরান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চালের দাম কিছুটা কম হলেও বেড়ে গেছে ডাল, আটা ও তেলের দাম। মিনিকেট চালের দাম আগে যেখানে ছিল ২৪০০-২৫০০ টাকা, প্রতি বস্তা এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০০০-২১০০ টাকায়। একই অবস্থা নাজিরশাইলসহ অন্যান্য চালের ক্ষেত্রেও। রিকশাচালক খোরশেদ বলেন, শুধু ভাত খাইলে তো আর পেট ভরবো না। ভাতের সাথে তো তরকারিও লাগবো। তরকারির এত দাম দেইখা মাঝে মাঝে লবণ আর পানি ডইলাই ভাত খাই। হাতিরপুল কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা এক ডাক্তার ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, সবজি কিনতে এলে মনে হয় যেন স্বর্ণের বাজারে আসছি। জিনিসপত্রের দাম দেখতে দেখতে একসময় কিছুই না কিনে খালি হাতে বাসায় চলে যাই। বেশির ভাগ ক্রেতাই দ্রব্যের দাম বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন। সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, একজন মহিলা ক্রেতা দীর্ঘক্ষণ একটি ব্যাগ নিয়ে হাতিরপুল বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার কাছে যখন জানতে চাওয়া হয় এমনটা করার কারণ কী। তখন তিনি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলেন, তার ছোট মেয়ে সবজি ছাড়া আর কিছুই খায় না অথচ দুই মাস ধরে তিনি পেঁপে আর কলমিশাক ছাড়া আর কোন সবজিই তার মেয়েকে খাওয়াতে পারেননি। তাই আজ বাজারে আসার সময় তার মেয়ে বারবার করে বলে দিয়েছে অন্য কোন সবজি আনতে। কিন্তু সবজির দামে হতাশ হয়ে তিনি এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছেন যদি কোথাও দাম একটু কম পান। বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। করলা, ঢেঁড়স, বরবটি পটোল, ঝিঙা, কাকরোল, চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে বাজারভেদে ৭০-৮০ টাকায়। প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। চালকুমড়া বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। থেমে নেই ভিটামিন এ-এর অন্যতম উৎস মিষ্টি কুমড়ার দামও। হাতিরপুল কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা এলিফ্যান্ট রোড নিবাসী সিদ্দিকুর রহমান জানান, অগে ৫০০ টাকা বাজার করলে ব্যাগ ভরে যেত আর এখন ৫০০০ টাকা নিয়ে এলেও কিছু হয় না। কিছুটা হলেও উত্তাপ কমেছে মুরগির মাংসের বাজারে। গত সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হতো কেজিপ্রতি ১৫০-১৫৫ টাকায়। এখন তা কমে বিক্রি হচ্ছে ১৩৫-১৪০ টাকায়। আবার পাকিস্তানি ছোট মুরগিগুলো মিলছে প্রতি পিস ১৫০ টাকায়। বড়গুলো বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ২৫০-৩০০ টাকায়। অপরিবর্তিত রয়েছে গরু ও খাসির মাংসের দাম। প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়। কাওরান বাজারে বাজার করতে আসা এক ক্রেতা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, সবজির দাম বেশি হওয়ায় রাগ করে মুরগি কিনে নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন। ৮ মাসের বাচ্চা আমার। ডাক্তার বলেছেন দিনে ৩ বাটি সবজি খিচুড়ি খাওয়াতে। কিন্তু সবজির যে দাম তাতে করে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। সরকারের কাছে তাই তার নিবেদন, বাচ্চাদের কথা বিবেচনা করে যেন সরকার সবজির দাম কমান। অস্থিতিশীল হয়েছে ছাত্র জীবনের একমাত্র ভরসা ডিমের বাজারও প্রতি ডজন ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে ১০৮-১১০ টাকা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিলন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, মাসের ২০ তারিখের পর থেকে ডিমই ছিল একমাত্র ভরসা। এ ডিমও এখন নাগালের বাইরে। এক হালি ডিম কিনতে তাকে এখন গুনতে হয় ৩৮ টাকা। মিলনের শঙ্কা, হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নেই যখন প্রতি হালি ডিমের দাম ৫০ টাকা হবে। দিনমজুর নওশাদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, ডাল দিয়ে ভাত খাবো সেই উপায়ও নেই। তিনি পরিবারসহ আগে ঢাকায় থাকতেন কিন্তু দ্রব্যের দাম অতিরিক্ত হয়ে যাওয়ায় সবাইকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, নিজেই খাইতে পারি না হ্যাগোরে আর কি খাওয়ামু। একই অভিযোগ মধ্যবিত্ত পরিবারের রেবেকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশে শুধু মানুষেরই দাম নাই আর সবকিছুর দাম আছে। সবকিছুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডালের দামও। মসুর ডাল দেশীটা বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায় আর ইন্ডিয়ানটা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। কথা হয় একটি প্রাইভেট ব্যাংকের এমডির সঙ্গে। তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, তিনি যখন লন্ডনে ছিলেন তখন ৮০-১০০ টাকা দরে সবজি কিনতেন। আর তাই বাংলাদেশে এখন বাজার করতে এলে দ্রব্যমূলের তালিকা দেখলে তার লন্ডনের কথা মনে পড়ে। বাঙালির প্রিয় খাবার যে মাছ, ভাত সেই মাছের বাজারেও ছড়িয়েছে উত্তাপ। মাছের প্রচুর চালান থাকলেও দাম কেন বেশি- এ প্রশ্নের উত্তরে এক মাছ বিক্রেতা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, সবকিছুর দামই বেশি, এখন তারা যদি বেশি দামে না বিক্রি করেন তাহলে খাবেন কী। ক্রেতাস্বল্পতার কারণে মাঝেমধ্যে লাভের চেয়ে অনেক কমেই বিক্রি করে দিতে হয় বলে জানালেন এ বিক্রেতা। বর্তমানে প্রতি কেজি রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩২০ টাকায়। কৈ মাছ পাওয়া যাচ্ছে ২৫০-২৭০ টাকা কেজিতে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ খাল-বিলে পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নদীর মাছের দাম আকাশছোঁয়া। প্রতি কেজি জাটকা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪৫০ টাকায় আর একজোড়া বড় ইলিশ মিলছে ১৫০০-১৮০০ টাকায়। হাতিরপুল কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা হাসানুর রহমান জানান, মেয়ের বায়না মেটাতে গিয়ে ইলিশ মাছ কিনতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হয়ে গেছে। এখন বাকি দিনগুলো অনেক হিসাব করে চলতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষসহ মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তসহ সবার জীবনেই দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। এজন্য বিক্রেতারা দায়ী করছেন অতিবৃষ্টি ও বন্যাকে। সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে সরকারের কঠোর নজরদারি আশা করছেন। তারা মনে করেন সরকার যদি এদিকে হস্তক্ষেপ করে তাহলে দ্রব্যমূলের দাম কমা সম্ভব। আসন্ন ঈদুল আজহাকে উপলক্ষ করে কোনভাবেই যেন আর দাম বৃদ্ধি না পায় এ বিষয়ে তারা সরকারের কঠোর নজরদারি কামনা করেছেন। তাদের একটাই কথা, সরকার চাইলে সবই সম্ভব। আর তাই তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সেই শুভ দিনের জন্য যেদিন তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত মূলে পণ্য কিনতে পারবেন।

হীরা পান্নাএক্সক্লুসিভ
লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। এ নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও অশান্তি। দফায় দফায় এভাবে দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রকাশ করেছেন তীব্র অসন্তোষ। বেশ কিছু নিত্যপণ্যের মূল্য গত সপ্তাহের চেয়ে এ সপ্তহে ১০-১২ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এসবকিছুর সঙ্গে থেমে নেই অতিপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পিয়াজ ও কাঁচামরিচের দামও।...