1441913295
সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে বিশ্বের প্রেক্ষাপট। আজকের দিনের এই প্রেক্ষাপটে নিত্যদিনের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে তথ্যপ্রযুক্তির নানা অনুষঙ্গের ব্যবহার। বিশেষ করে যোগাযোগ থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন—প্রভৃতি ক্ষেত্রেই গতি, দক্ষতা আর স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে প্রযুক্তি অন্যতম ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তির নানা অনুষঙ্গের মধ্যে আবার ইন্টারনেট রাখছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইন্টারনেটকেই তাই আধুনিক সময়ের উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে মনে করছেন সকলে। আমাদের দেশেও এখন ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে। এই ইন্টারনেটের সুফল যাতে দেশের সর্বস্তরের মানুষ কার্যকরভাবে উপভোগ করতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়েই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ইন্টারনেট নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে এবং ইন্টারনেটের ব্যবহার স্বচ্ছন্দ্য করে তুলতে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক ২০১৫। ‘উন্নয়নের পাসওয়ার্ড আমাদের হাতে’ স্লোগান নিয়ে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী এই ইন্টারনেটের উত্সবের পর্দ নামছে আজ।
আয়োজনের পেছনের কথা

বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক ২০১৫ আয়োজনের কারিগরি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এবং দেশের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোন। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প, দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম শীর্ষ সংগঠন বেসিসের ওয়ান বাংলাদেশ এবং টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের ইন্টারনেট ফর অল—এই সকল ভিশনের মূলেই রয়েছে দেশের প্রতিটি মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তিতে স্বাক্ষর করে তোলা, যার মাধ্যমে দেশের মানুষরা ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজেদের উন্নয়ন করতে পারবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও তাই ইন্টারনেটকে পরিচিত করে তুলতে আয়োজন করা হয় বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক ২০১৫। আর তাই দেশে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি উত্সব বা প্রদর্শনী এতদিন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকা বা বড় বড় শহরগুলোকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হলেও ইন্টারনেট উইক আয়োজিত হয়েছে দেশব্যাপী। ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেটে তিনটি বড় আকারের মেলা ও প্রদর্শনী আয়োজন করা হলেও ইন্টারনেট উইকের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের ৪৮৭টি উপজেলায় একযোগে ইন্টারনেটের মেলার আয়োজন। একটি নির্দিষ্ট মেলা বা প্রদর্শনী এভাবে একযোগে ৪৮৭টি স্থানে আয়োজন করার নজির বিশ্বে আর নেই। ফলে প্রকৃত অর্থেই ইন্টারনেট উইকের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছানোর।

ভিন্ন আয়োজনে শুরু ইন্টারনেট সপ্তাহ

সাধারণভাবে যেকোনো উত্সবের সাথে ইন্টারনেট উইকের পার্থক্য ছিল নানা ক্ষেত্রেই। ২ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আলপনা আঁকার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উত্সবের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। দেশীয় ইন্টারনেটনির্ভর ব্র্যান্ডগুলো ওই রাতে রঙ-তুলিতে নিজেদের আইকনগুলো ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে এই প্রচারণার সূচনা করেন।

এরপর ৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক ২০১৫। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন এই আয়োজনের। এসময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বেসিস সভাপতি শামীম আহসান, গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব শেঠিসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই। ওই সময় বনানী সোসাইটি মাঠে আয়োজিত ইন্টারনেট উইকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, আইসিটি সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার। প্রধানমন্ত্রী তাদের সাথেও কথা বলেন। একইসাথে দেশব্যাপী শুরু হওয়া এই উত্সবে আরও কয়েকটি স্থানের আয়োজনে স্থানীয়দের সাথে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। ইন্টারনেট উইকের অংশ হিসেবে বনানী খেলার মাঠেও ছিল আয়োজন। প্রধানমন্ত্রী যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্টারনেট উইকের উদ্বোধন করছিলেন, তখন তা সরাসরি বড়পর্দায় বনানী মাঠের মেলা প্রাঙ্গণে দেখানো হয়।

নানা আয়োজন

ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেটে তিনটি বড় এক্সপোসহ দেশের ৪৮৭টি উপজেলা ডিজিটাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই ইন্টারনেট মেলা। এর মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর শেষ হয় বনানী মাঠের মেলার আয়োজন। এই মেলায় দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স কোম্পানি, মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান, ওয়েব পোর্টাল, ডিভাইস কোম্পানিসহ ইন্টারনেট ভিত্তিক পণ্য ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান—সকলেই অংশ নিয়েছে ইন্টারনেটের এই মহা উত্সবে। প্রতিবছর এক কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক তৈরির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ইন্টারনেট সেবার পসরা প্রদর্শন করেছে দর্শনার্থীদের সামনে। বনানী মাঠের এক্সপোর পর বুধবার রাজশাহীর নানকিন বাজারে শুরু হয় রাজশাহীর বৃহত্ আয়োজন। রাজশাহীবাসীদের জমজমাট অংশগ্রহণে এই এক্সপোতে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী রাজশাহীতে সিলিকন ভ্যালি গড়ে তোলার ঘোষণাও দিয়েছেন। বড় এক্সপোর শেষটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ সিলেটে। এর বাইরে সপ্তাহ ধরেই চলছে ৪৮৭টি উপজেলায় ইন্টারনেট মেলার আয়োজন। কোথাও দুই দিনের জন্য, কোথাও তিন দিনের জন্য, কোথাও সপ্তাহজুড়েই চলেছে এই আয়োজন। কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্করাও ব্যতিক্রমী এই মেলায় এসেছেন এবং ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতের সাথে নিজেদের পরিচিত করে নিয়েছেন। এসব মেলায় শিক্ষার্থীদের যেমন পরিচিত করিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইন্টারনেটের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের সাথে, তেমনি কৃষকদের পরিচিত করিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের কৃষিকাজ সংক্রান্ত তথ্যগুলো কীভাবে পাওয়া যায় তার ঠিকানার সাথে। অন্যান্য মানুষরাও জানতে পারছেন ইন্টারনেট থেকে কীভাবে বৈচিত্র্যময় সব বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানা যায় কিংবা খুঁজে বের করা যায় নিজের প্রয়োজনীয় পণ্যটি। অনলাইনে বেচাকেনা কিংবা অনলাইনে স্বাস্থ্যসেবার বিষয়গুলোর সাথেও পরিচিত হয়েছেন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষরা।

সেমিনার ও কর্মশালা

কেবল উত্সব আর মেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না বাংলাদেশ ইন্টারনেট উইক ২০১৫। এর সাথে সাথে ছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ১৯টি টেক সেশন। গণমাধ্যমে ৭টি পলিসি বৈঠকও প্রচার হয়েছে। আর দেশের প্রায় অর্ধশত বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত হয়েছে অর্ধশতাধিক কর্মশালা, সেমিনার ও টেক ইভেন্ট। সপ্তাহের প্রতিটি দিনই দেশের কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল এমন কোনো কর্মশালা, সেমিনার বা ইভেন্ট। অনলাইনে আয়, ভবিষ্যতের ইন্টারনেট, ফ্রিল্যান্সিং, ইন্টারনেট ব্যবহার করে উচ্চশিক্ষা ও ডিগ্রি অর্জন, ক্লাউড কম্পিউটিং, ই-কমার্স, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, বিগ ডাটা, প্রোগ্রামিং, সাইবার নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়গুলো নিয়ে অনুষ্ঠিত এসব সেমিনার ও কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও উত্সাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

চাই ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ব্যতিক্রমী আয়োজনই ছিল ইন্টারনেট উইক। এর আয়োজকরা আশা করছেন, প্রতিবছর এক কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির যে লক্ষ্য তারা গ্রহণ করেছেন, তা এবারের আয়োজনের মাধ্যমে সহজেই অর্জিত হবে। বিভিন্ন বয়সী ও শ্রেণি-পেশার মানুষের ইন্টারনেটের প্রতি উত্সাহ এই আয়োজনকে সফল করে তুলেছে। তবে ভবিষ্যতে এমন ধরনের আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষরাও ইন্টারনেটের সুফল ভোগ করতে পারবেন, এমনটাই মনে করছেন আয়োজনে অংশগ্রহণকারীরা। আয়োজকরাও এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

হাসন রাজাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে বিশ্বের প্রেক্ষাপট। আজকের দিনের এই প্রেক্ষাপটে নিত্যদিনের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে তথ্যপ্রযুক্তির নানা অনুষঙ্গের ব্যবহার। বিশেষ করে যোগাযোগ থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন—প্রভৃতি ক্ষেত্রেই গতি, দক্ষতা আর স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে প্রযুক্তি অন্যতম ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তির নানা অনুষঙ্গের মধ্যে আবার ইন্টারনেট রাখছে সবচেয়ে...