Oporadher Dairy Theke
মাইলের পর মাইল মাঠ জুড়ে তাজা সবুজ ঘাসে মুখ ডুবিয়ে আছে হাজার হাজার গাভী। তাদের আবার নামও আছে, কারো নাম শাবানা, কারো ববিতা। আবার কেউ মৌসুমী, শাবনুর। আছেন সুচিত্রাও। আর নাম ধরে ডাকলেই হাম্বা হাম্বা করে ছুটে আসে তারা। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও একদম সত্যি!

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় সরকারি খাস জমিতে গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ এ গোচারণ ভূমি। এতে চষে বেড়ায় এক লাখেরও বেশি গরু। এ গোচারণ ভূমির শত শত বাথানের উন্নত জাতের গাভীর উপর নির্ভর করেই শাহজাদপুরের বাঘাবাড়িতে গড়ে উঠেছে মিল্ক ভিটার বিশাল দুগ্ধ কারখানা।

সমপ্রতি সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়িতে গেলে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে শুধু মিল্ক ভিটাই নয়, বেসরকারিভাবেও আরো প্রায় ২০টি দুগ্ধ উত্পাদন ও শীতলীকরণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে পাবনা-সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, বেড়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলায়।

দেশের গ্রামীণ জনপদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দুগ্ধ উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে শাহজাদপুরের বাঘাবাড়িতে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ দুগ্ধ উত্পাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড বা মিল্কভিটা। মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের দরিদ্র, ভূমিহীন ও নিম্নবিত্ত দুগ্ধ উত্পাদনকারী কৃষকদের সমবায়ের মাধ্যমে সু-সংগঠিত করে, তাদের গবাদিপশু থেকে উত্পাদিত দুধের ন্যায্যমূল্য প্রদান। এছাড়া শহরাঞ্চলে নায্যমূল্যে খাঁটি দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহ নিশ্চত করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার তিন যুগ পার হলেও মিল্কভিটা একদিকে যেমন তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি অন্যদিকে সম্ভাবনাময় এ প্রতিষ্ঠানটি নানা সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

মিল্ক ভিটায় দীর্ঘদিন ধরে চলা নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের লুটপাটের কারণে অনেকটা মুখ থুবরে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দুধের নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে খামারিরা। এছাড়া গো-খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ভেজাল খাবার, বাথান এলাকা সংকুচিত হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে অনেক খামারি তাদের পেশা ছাড়ছেন। অনেক খামারি হতাশ। কারণ মিল্ক ভিটাকে কেন্দ্র করে তারা স্বপ্ন বুনেছিল সোনালী ভবিষ্যতের। মিল্ক ভিটার মত সমবায়ী ও উজ্জল সম্ভাবনাময় একটি প্রতিষ্ঠান কেন সমপ্রসারিত হতে পারেনি- এ প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে গেছে। মেশিনারি ক্রয় থেকে শুরু করে নিয়োগ, খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ সবকিছুতেই এখানে দুর্নীতি। সেইসাথে রয়েছে রাজনীতিকরণ। ২০০৫ সালে নরসিংদীতে ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে শিবপুর দুগ্ধ কারখানা স্থাপন করা হয়। যা এখন বন্ধ। সূত্র জানায়, তত্কালীন স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রী নিজ এলাকায় এই দুগ্ধ কারখানাটি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু এসব এলাকা দুধ উত্পাদনের উপযোগী নয়। একইভাবে বৃহত্তর নোয়াখালীর রামগঞ্জ, রায়পুর, সুবর্ণচর ও বরিশালের স্বরূপকাঠিতে দুগ্ধ কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। অথচ এসব এলাকায় দুধ সংগ্রহের পরিমাণ খুবই কম। এখানে সংগৃহীত এক কেজি দুধের দাম পড়ে ৯০ টাকা। আবার দুধের মানও ভালো না। ফলে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি।

২০০৬ সালে মিল্কভিটা কারখানা প্রাঙ্গণে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে কনডেন্স মিল্ক তৈরির প্লান্ট বসানো হয়। এর ৭ দিন পর থেকেই প্লানটি বন্ধ। কারণ, প্লান্টে তৈরি কনডেন্স মিল্ক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাতে ছত্রাক পড়ে।

সূত্র জানায়, এসব নানা অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে আগাতে পারছে না মিল্কভিটা। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করলেও ১৯৯১-৯২ অর্থ বছরে প্রথম লাভের মুখ দেখে। এই বছরে প্রতিষ্ঠানটি ৮৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা মুনাফা করে। এরপর ২০০৩-০৪ অর্থ বছর পর্যন্ত টানা মুনাফা করলেও ২০০৪-০৫ অর্থ বছর থেকে মুনাফার পরিমাণ কমতে থাকে। মাঝে ২০০৬-০৭ অর্থ বছরের আবার লোকসান করলেও ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১১ কোটি ৪৫ লাখ ও ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকা মুনাফা করে। এরপর আবার মুনাফার পরিমাণ কমতে থাকে।

এ প্রসঙ্গে মিল্কভিটার অন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য (পরিচালক) এ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল হামিদ লাবলু গতকাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, দুর্নীতি ছিল মিল্কভিটার প্রধান সমস্যা। চার মাস আগে অন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি যখন দায়িত্ব নেয় তখন প্রশাসন বলতে কিছু ছিল না। ভেজাল দুধ পাওয়ায় ইতিমধ্যে অনেক সমিতিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন মিল্কভিটা পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত হয়েছে সে কথা বলব না। তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, এখানে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা কাজ করতে দেয় না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, মিল্কভিটার লোকসান হওয়ার কথা না। ইতিমধ্যে আমরা মিল্কভিটার দুধ সারাদেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশের গো-খামারিদের উত্পাদন ব্যয় কমাতে ও এ শিল্পকে লাভজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার লাহিড়ীমোহনপুর এলাকায় ২৭ কোটি টাকা ব্যায়ে একটি গোখাদ্য প্লান্ট নির্মাণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সস্তায় খামারীদের মধ্যে উন্নতমানের গোখাদ্য সরবরাহ করা হবে।

গো-খাদ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং আমদানিকৃত নিম্নমানের দুধে বাজার সয়লাব হওয়ায় শাহজাদপুরের খামারিদের লোকসানের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

মিল্ক ভিটার আওতাভুক্ত রেশমবাড়ী প্রাথমিক দুগ্ধ উত্পাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আব্দুস সামাদ ফকির ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, তার সমিতি থেকে প্রতিদিন ৫ হাজার লিটার দুধ সরবরাহ করা হয় মিল্ক ভিটায়। এই সমিতিতে ১৩২ জন প্রান্তিক কৃষক রয়েছেন। এর মধ্যে অনেক ভূমিহীন কৃষকও আছেন। যাদের আয়ের একমাত্র অবলম্বন গো-খামার। কিন্তু এখন খো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় গরু পালনে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের।

পোতাজিয়া দুগ্ধ উত্পাদনকারি সমবায় সমিতির সভাপতি শহিদ আলী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, খামারীরা দুধের ন্যায্যমূল্য পেলে তারা দুধ উত্পাদনে আরো উত্সাহিত হবে।

খামারিরা দুধের নায্যমূল্য না পেলেও দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো অধিক মুনাফা করছে বলে অভিযোগ করেছেন খামারীরা। খামারীরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানায়, তাদের কাছ থেকে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি লিটার তরল দুধ ৪০ টাকা দরে ক্রয় করে তা প্যাকেট করে ৬২ থেকে ৬৪ টাকা দরে বিক্রি করছে। এছাড়া দুধের ননী তুলে মাখন ও এক লিটার তরল দুধ থেকে ২৬ টাকার ঘি তৈরি করছে। সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিলিটার দুধ বিক্রি করছে ৮৮ টাকা দরে।

দেশের চাহিদা মিটিয়ে দুধ রপ্তানি করছে ভারত

প্রতিবেশী ভারত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এখন দুধ রপ্তানি করছে। তাদের গুজরাটে অবস্থিত ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (এনডিডিবি) আওতায় সমবায় ভিত্তিতে ভারতের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলে ভাগ করে উত্পাদিত দুগ্ধ ‘আমূল’-এর মাধ্যমে সমগ্র ভারতে বাজারজাত করা হচ্ছে। উদ্বৃত্ত দুধ রপ্তানি করছে বিদেশে। শুধু আমূল নয়, মেহসানা, বিদ্যা ডেইরীসহ আরো অনেক সফল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তাদের। মেহসানার যে এলাকা এক সময় মরুভূমি অঞ্চল ছিল, সেখানে এখন রাস্তায় দুধের ট্যাঙ্কার। খামারীরা সমবায় সমিতির মাধ্যমে ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠিকে দুধের যোগান দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে মহিলা সমবায়ীরা।

দুধ উত্পাদন অঞ্চল গড়ার কাজ করছে বেসরকারি দুগ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো

নানা সমস্যা থাকলেও দুধ উত্পাদন অঞ্চল গড়ার কাজ করছে বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্র্যাক ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টস (আড়ং দুধ), প্রাণ ফুডস (প্রাণ দুধ), রংপুর ডেইরি প্রোডাক্টস (আরডি মিল্ক), আকিজ ডেইরি, বিক্রমপুর ডেইরি, শিলাইদহ ডেইরি, নিউজিল্যান্ড ডেইরি প্রোডাক্টস বাংলাদেশ লি:, আরলা, বিক্রমপুর ডেইরিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাজারে তরল ও গুঁড়ো দুধ সরবরাহ করছে।

এ প্রসঙ্গে প্রাণ ফুডস-এর বাজারজাতকরণ বিভাগের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, প্রাণ দেশে দুধের উত্পাদন বাড়ানোর জন্য কাজ করছে। ভরা মৌসুমে খামারীরা যাতে তাদের উদ্বৃত্ত দুধ নিয়ে বিপাকে না পড়েন, সে জন্য গুঁড়ো দুধের কারখানা করেছে প্রাণ। তবে তরল দুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কারখানার উত্পাদন ক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা জাত উন্নয়নের জন্য খামারীদের গরুর কৃত্রিম প্রজননের ব্যবস্থা করি। এছাড়া গো-খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি চিকিত্সাসেবাও দেয়া হয়। দুধের উত্পাদন বাড়াতে ভালো জাতের গরুর উত্পাদন বাড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে ডেইরি শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

হাসন রাজাঅপরাধের ডায়েরী থেকে
মাইলের পর মাইল মাঠ জুড়ে তাজা সবুজ ঘাসে মুখ ডুবিয়ে আছে হাজার হাজার গাভী। তাদের আবার নামও আছে, কারো নাম শাবানা, কারো ববিতা। আবার কেউ মৌসুমী, শাবনুর। আছেন সুচিত্রাও। আর নাম ধরে ডাকলেই হাম্বা হাম্বা করে ছুটে আসে তারা। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও একদম সত্যি! সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর...