1003727_10200514156557256_360405007_n_108172
এক. পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ছুরি হলো ডাক্তারের ছুরি, আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ‘স্যরি’ হচ্ছে ডাক্তারের ‘স্যরি’। অথচ দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য আগামী দিনে এমন চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে যারা মেধা ও যোগ্যতার বদলে প্রশ্ন চুরি করে পাস করা হবেন। আগামী দিনে রোগীরা চিকিৎসা নেওয়ার আগে ডাক্তারকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করবে ‘আপনি ২০১৫ ব্যাচের ডাক্তার কিনা?’ দেশের অন্যান্য সব পাবলিক পরীক্ষার মতো মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও এবার যথারীতি ফাঁস করা হলো। এ পরীক্ষার ফলও আবার প্রকাশ করা হলো। বঞ্চিত ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে মানববন্ধন করলে পুলিশ এসে তাদের গ্রেফতার করল। বাহ ভালোই তো, প্রশ্নচোররা অসৎভাবে ডাক্তার হবে, অন্যদিকে মেধাবীরা রাস্তায় ঘুরবে আর পুলিশের হাতে মার খাবে! বরিশালে একটা কথা প্রচলন আছে, ‘মাইরও খাবি, মাইরের দামও দিবি, আবার কানবি ফাও…!’ সমাজ কতটা হীন, নষ্ট ও বর্বর হলে এভাবে আজীবন স্বপ্নে লালিত মেধাবী প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

দুই. আশ্চর্যের বিষয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের এ ঘটনা পুরো দেশের মানুষ জানলেও জানেন না শুধু আমাদের শিক্ষামন্ত্রী! পরীক্ষার আগের রাতে ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমের সুবাদে ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। আবার পরদিন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে তা হুবহু মিলেও যায়। র‌্যাব অভিযান চালিয়ে মহাখালী থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের মূল হোতা জসিম উদ্দিন ভূইয়াকে আটক করে। সঙ্গে প্রশ্নপত্র বিক্রির ১ কোটি ২১ লাখ টাকার চেকও উদ্ধার করে। মানুষকে হতবাক করে আটক করা হয় ইউজিসির এক সহকারী পরিচালকসহ তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে। প্রশ্ন ফাঁস যদি না-ই হয়ে থাকে তবে তাদের আটক করা হলো কেন? তাদের চাকরি থেকে বরখাস্তই বা করা হলো কেন? আসলে সরষের মধ্যেই যে ভূত লুকানো আছে তা আমরা এতদিন ধরে বলে আসলেও এবার তা স্বচক্ষে অবলোকন করলাম!

তিন. এ ঘটনায় সারা দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অন্তত ৪২ জনকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের কয়েকজন হোতাও রয়েছেন। এরা এর আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁস করার অপরাধে জেল খেটেছেন। কোটি কোটি টাকার লেনদেনও হয়েছে। ইন্টারনেট খুললে প্রশ্ন ফাঁসের শত সহস্র প্রমাণ চোখের সামনেই ভেসে ওঠে। গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তি অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পেয়ে এ অভিযানের পুরো কৃতিত্ব দাবি করলেও সরকার কী করে এখন বলছে যে প্রশ্নপত্র নাকি ফাঁসই হয়নি! এত কিছুর পরও সরকার কেন গায়ের জোরে ফাঁস করা প্রশ্নপত্রে নেওয়া পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে চরম এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল? এতগুলো অভিযোগের পরও কোনো তদন্ত না করে ফল প্রকাশ করা হলো কার স্বার্থে? ফলটা স্থগিত রাখলেই বা কার কি ক্ষতি হতো? রাষ্ট্র কি এতটাই দুর্বল হয়ে গেল যে, লাগাতার প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে পারছে না? বঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দুঃখ করেই বলতে ইচ্ছা করে, ‘তোমরা মেধার প্রতিযোগিতায় হারনি, হেরেছ রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কাছে!’

চার. গত বছর মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ প্রাপ্ত নম্বর ছিল প্রায় ৮২। আর সর্বনিম্ন ৫৭র কাছাকাছি। অথচ এবার সিংহভাগই পেয়েছে ৯০ এর ওপর নম্বর। শত শত পরীক্ষার্থী পেয়েছে ৯৮, ৯৯ নম্বর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন মেডিকেল পরীক্ষায় ১০০ তে ৯৯ বা ৯৮ নম্বর পাওয়া একেবারে অসম্ভব। দেশের মানুষের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে জনগণের কষ্টের পয়সায় আমরা মেধাশূন্য প্রশ্নচোর এসব ভবিষ্যতের রোগী মারার কারিগরদের তৈরি করতে পারি না। তাই সর্বাগ্রে জালিয়াতির এ পরীক্ষাকে বাতিল করতে হবে। আবার নতুন করে পরীক্ষা নিতে হবে। এতে কর্তৃপক্ষ হয়তো সামান্য একটু বাড়তি যন্ত্রণা পোহাবেন সত্য, তবে সেটা হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীর হতাশা ও যন্ত্রণার তুলনায় একেবারেই নগণ্য।

পাঁচ. আসলে দেশের মানুষ নিজের টাকা খরচ করে ডাক্তার বানায় নিজেদের জান বাঁচানোর প্রয়োজনে। তাদের তো আর সিঙ্গাপুর, বিলেত কিংবা আমেরিকা গিয়ে চিকিৎসা করার সুযোগ নেই। এ পর্যন্ত দেশের এমন কোনো প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি-মন্ত্রী-এমপি আছেন কিনা যারা সিঙ্গাপুর, লন্ডন, আমেরিকা ছাড়া নিজেদের চিকিৎসা দেশে নিয়েছেন? এটা আসলেই একটি কোটি টাকার প্রশ্ন। সে যাই হোক, প্রশ্নচোর ডাক্তার দিয়ে হলেও দেশের মানুষগুলোর তো আর চিকিৎসা পাওয়ার অন্য কোনো গন্তব্য নেই। ছোটবেলায় শিশুতোষ ছড়া পড়েছিলাম, ‘সফদার ডাক্তার, মাথা ভরা টাক তার, খিদে পেলে পানি খায় চিবিয়ে।’ এত বছর পর আবার যদি এরকম শিশুতোষ ডাক্তার বাস্তবে দেখা যায় তখন হয়তো বলতে হবে, ‘খিদে পেলে মানুষ খায় চিবিয়ে।’ আসলে একজন ডাক্তার তার রোগীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত আপনজন। ডাক্তারের সামান্য একটা আশ্বাসও রোগীকে বাঁচতে শেখায়, অনুপ্রেরণা জোগায়। কিন্তু দেশের সাধারণ, মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষার্থীরা যদি এভাবে প্রশ্নচোরদের হাতে পরাস্ত হয় আর রাষ্ট্র যদি অসহায়ের ভান করে দুর্বৃত্তায়নের পথকে সুপ্রশস্ত করে দেয়, তবে অচিরেই ‘মুন্না ভাই’ স্টাইলে প্রশ্নচোর এমবিবিএসরা আমাদের ‘মামু’ বানিয়েই চিকিৎসাসেবা দেবেন। তখন ডাক্তারের ‘স্যরি’ হবে আমাদের জীবনের শেষ বাক্য!

লেখক : সুপ্রিমকোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ।

শুভ সমরাটমতামত
এক. পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ছুরি হলো ডাক্তারের ছুরি, আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর 'স্যরি' হচ্ছে ডাক্তারের 'স্যরি'। অথচ দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য আগামী দিনে এমন চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে যারা মেধা ও যোগ্যতার বদলে প্রশ্ন চুরি করে পাস করা হবেন। আগামী দিনে রোগীরা চিকিৎসা নেওয়ার আগে ডাক্তারকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করবে 'আপনি ২০১৫...