02_259392
বিশ্ববিদ্যালয় নামের মধ্যেই তার অর্থের ইঙ্গিত রয়েছে। বিশ্বকে তথা জ্ঞানবিশ্বকে ধারণ করে শিক্ষাদান ও শিক্ষার প্রসার ঘটাবে বলেই তা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে এ চিন্তাই কাজ করেছিল। দীর্ঘ সময় এ দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কালের পরিক্রমায় সে পরিস্থিতি বদলেছে। এ শিক্ষাঙ্গনে- এখন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নেই, ছাত্র-শিক্ষক সৌহার্দ্য নেই, পাঠে ও পাঠদানে মনোযোগ নেই, বিদ্যাচর্চার চেয়ে বিদ্যাজীবিতার রাজনীতি বড় হয়ে উঠেছে। এসব নিয়েই এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনমালা

‘রুমে সিট আছে দুজনের। ঘুমাই আট-দশজন। দরকারি জিনিস রাখব কোথায়? ছারপোকার অত্যাচারে মাঝে মাঝে ছাদে গিয়ে ঘুমাতে হয়। পড়াশোনার ন্যূনতম পরিবেশ নেই। ঘুমানোর জায়গা নিয়ে মাঝে মাঝে মারামারি, হাতাহাতি হয়। প্রতিদিন কোনো না কোনো জিনিস খোয়া যায়। হল লাইব্রেরিতেও পড়তে বসার জায়গা পাওয়া যায় না।’

জায়গা নেই ঘুমানোরও

গত এক বছরের অভিজ্ঞতার বয়ান এভাবেই দিচ্ছিলেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের বাসিন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র আবুল কালাম।

আবুল কালামের কথা যেন শেষ হচ্ছিল না- ‘আর বাথরুম! সে এক নরক! গোসলখানায়, টয়লেটের মেঝেতে যেন হাজার বছর ধরে শ্যাওলার বাস। কবে যে পরিষ্কার করা হয়েছে, বলা মুশকিল। হলে সুখ নাই রে ভাই!’

শুধু কালাম নন, এ অভিজ্ঞতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাসিন্দা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর। সেই হল ছাত্রদের হোক কিংবা ছাত্রীদের- কাহিনী সবখানে একই। দুজনের সিটে চারজনের থাকা স্বাভাবিক ঘটনা।

রাজনৈতিক পরিচয়ের রুমগুলোর অবস্থা কী তা শুরুতেই বলা হয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হলগুলোতে বৈধ শিক্ষার্থীর বাইরেও অনেক শিক্ষার্থী থাকে। তাদের কেউ অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, কেউ হলেরই সাবেক ছাত্র। রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়ে হলে বসবাসরত এসব শিক্ষার্থীর মূল কাজ রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মিছিলে অংশ নেওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের আসন সংকট ছাত্ররাজনীতির বড় অনুষঙ্গ। সিট দখলের মাধ্যমে মূলত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক-অনুগামীরা এ চর্চা করে। উদ্দেশ্য, আধিপত্য কায়েম ও বিস্তার। অন্যরাও যে করে না তা নয়। ক্ষমতাসীনদের সমর্থক-অনুগামী ছাত্রনেতাদের অনেকে সিট-বাণিজ্যও করেন। প্রশাসন এ ব্যাপারে চির-উদাসীন। এসব কারণে হলগুলোতে পড়াশোনা, বসবাস, ক্রীড়া-সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত।

প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০টি বিভাগে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩৭ হাজার। ২০টি হল ও দুটি হোস্টেলে মোট ১৩ হাজার ৭১০ জনের আবাসন সুবিধা রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রাবাসগুলোতে বাস করছে ২১ হাজার শিক্ষার্থী। এ ছাড়া প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে অবৈধভাবে বাস করছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও তিতুমীর কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করছেন এ রকম বেশ কিছু সাবেক ছাত্রের খোঁজও পাওয়া গেছে। এখনো তাঁরা হলে বাস করছেন রাজার হালে।

কেন এ অবস্থা? জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, প্রশাসন থেকে আবাসনের অনুমোদন পাওয়া গেলেও হলে থাকার কার্যকর অনুমতি দেন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ছাত্রনেতারা। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নিলে থাকা যাবে না- এটাই অলিখিত নিয়ম। এ নিয়ম না মানায় অনেক বৈধ শিক্ষার্থীকে বিতাড়িত হতে হয়েছে হল থেকে। তিনি বলেন, ‘এই যেমন আমার নামে বরাদ্দ সিটে থাকছেন ক্ষমতাসীন দলের এক বড় ভাই। পড়াশোনা শেষ করে তিনি একটি ব্যাংকে চাকরি করছেন। প্রতিবাদ করলে আমাকেই হল ছাড়তে হতো। আমি মেনে নিয়েছি। এ রকম অভিজ্ঞতা হলের প্রায় সব বৈধ শিক্ষার্থীর।’

২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে উর্দু বিভাগে ভর্তির পর মোসলেম উদ্দিন এলাকার বড় ভাইদের সহায়তায় জসিমউদ্দীন হলে ওঠেন। যে কক্ষটিতে তিনি আছেন, সেখানে আরো ৯ জন থাকে। অথচ কক্ষটিতে সিট মাত্র দুটি। রাজনৈতিক সহায়তায় হলে ওঠার বিনিময়ে তাঁকে প্রতিদিনই রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে যেতে হয়। শুধু মোসলেম নন, প্রায় সব শিক্ষার্থীকেই সিট বরাদ্দ পাওয়ার পরও বড় ভাইদের দ্বারস্থ হতে হয়। আর ছোট ভাইকে হলে তোলার বিনিময়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করেন তাঁরা।

মোসলেম উদ্দিন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘ভর্তির পরই হলের গণরুমে থাকার সুযোগ পেয়েছি। বাইরে থেকে এসে ক্লাস করার চেয়ে ক্যাম্পাসে থাকা অনেক সুবিধাজনক। মিটিং-মিছিলে যেতে হলেও বাইরে থাকার কষ্টটা তো আর হয় না। তবে মিছিল-মিটিংয়ে না গেলে গালমন্দ শুনতে হয়; হুমকি-ধমকি সহ্য করতে হয়। এটাই কষ্টদায়ক।’

শিক্ষার্থীরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, কাউকে হল থেকে নামিয়ে দেওয়া বা মারধর করা হলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয় না। গত বছর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ায় শতাধিক শিক্ষার্থীকে হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

শিক্ষার্থীরা আরো জানান, পড়াশোনা শেষ করেও অনেক ছাত্রনেতা হলে থাকছেন। প্রশাসন তাঁদের কিছু বলে না। স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার নামে বরাদ্দ করা আসনটিতে একজন ছাত্রনেতা দুই বছর ধরে একাই থাকছেন। তাঁর পড়াশোনা শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। তাঁকে সিট ছাড়তে বলেনি প্রশাসন। আমি বললে আমাকেই হল ছাড়তে হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সব হল কমিটির শীর্ষ নেতাদের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগে। এ রকম দুই শতাধিক নেতা এখনো ঢাবির বিভিন্ন হলের কক্ষ দখল করে রেখেছেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, হল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে বহিরাগতরাও হলে অবস্থান করছে। হল প্রশাসন সক্রিয় হলে আবাসন সংকটের নিরসন হবে। ক্যাম্পাসে অনেক অপরাধও কমে যাবে।

হল প্রশাসনের শীর্ষব্যক্তি হলেন প্রাধ্যক্ষ (প্রভোস্ট)। কয়েকজন প্রাধ্যক্ষ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, আসন অনুযায়ীই বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেকে অবৈধভাবে থাকছে। এটা সবাই জানে। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক ছাত্রনেতাদের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। তাঁরা জানান, এর আগে হলে নিয়ম চালু করতে গিয়ে ছাত্রনেতাদের তোপের মুখে পড়েছিলেন কবি জসিমউদ্দীন হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও মাস্টারদা সূর্যসেন হলের প্রাধ্যক্ষরা।

সুষ্ঠু আবাসনের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্যও নেই হলগুলোর। বসবাস স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টারের ডাক্তার শাহজাহান কামাল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, মেডিক্যাল সেন্টারে যেসব রোগী আসে তাদের বেশির ভাগই চর্মরোগে আক্রান্ত। এক জায়গায় গাদাগাদি করে বহু শিক্ষার্থী থাকছে, একে-অন্যের জিনিস ব্যবহার করছে। এ কারণে একজনের রোগ ছড়িয়ে পড়ছে অন্যজনে।

হলগুলোতে ছারপোকার উপদ্রবে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা। সূর্যসেন হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ভাই, ছারপোকার অত্যাচারে ত্রাহি দশা। রাতে ঘুমাতে পারি না। প্রতিদিন বালিশ-চাদর রোদে দিই; কিন্তু লাভ হয় না। ছারপোকারা ধেয়ে আসে। বারবার বলার পরও হল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি।’

ছাত্রী হলের পরিস্থিতি : ছাত্র হলের তুলনায় সমস্যা কম। হল প্রশাসন ফলাফলের ভিত্তিতে এক সিটে দুজন করে বরাদ্দ দেয়। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেত্রীরাও প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই ছাত্রীদের হলে তোলেন। রাজনৈতিকভাবে ওঠানো ছাত্রীদের প্রথমে জায়গা দেওয়া হয় গণরুমে। ওই সব রুমে আটজনের জায়গায় ২০ জনও থাকে।

শামসুন নাহার হলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী রওশান আরা নিতুল ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, হলের সিট বণ্টন সাধারণত প্রশাসনের মাধ্যমে হয়। রাজনৈতিক পরিচয়ে হলে ওঠা ছাত্রীদের স্থান হয় গণরুমে। কোনো কোনো গণরুমে ২০-২২ জনকে থাকতে হয়। অন্য কোনো রুমে সিট ফাঁকা হলে ক্রমান্বয়ে তাদের স্থানান্তরিত করা হয়।

প্রশাসনের বক্তব্য: উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করা হলেও আবাসন সংকট থেকেই যাচ্ছে। হল প্রশাসনকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে।

অর্ণব ভট্টএক্সক্লুসিভ
বিশ্ববিদ্যালয় নামের মধ্যেই তার অর্থের ইঙ্গিত রয়েছে। বিশ্বকে তথা জ্ঞানবিশ্বকে ধারণ করে শিক্ষাদান ও শিক্ষার প্রসার ঘটাবে বলেই তা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে এ চিন্তাই কাজ করেছিল। দীর্ঘ সময় এ দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে কালের পরিক্রমায় সে পরিস্থিতি বদলেছে। এ শিক্ষাঙ্গনে- এখন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নেই, ছাত্র-শিক্ষক...