APORADHER DAYRE THEKE
বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় জাল সনদ দিয়ে ৩৬৩ শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের শনাক্ত করেছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর (ডিআইএ)। একই সঙ্গে ৮ হাজার ৬৯৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারের ১৫৭ কোটি টাকা লোপাটের তথ্যও চিহ্নিত করে তারা। এসবের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে সংস্থাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ১ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় এদের দুর্নীতির বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে দু’জন কর্মকর্তা বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন । এক পর্যায়ে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তারা শান্ত হন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, জাল সনদধারীরা শিক্ষক নন, তারা প্রতারক। এসব প্রতারক পার পাবে না। তাদের অনৈতিক সুবিধা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কেউ ছাড় দিলে তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘সবখানেই কম-বেশি স্বচ্ছতার অভাব আছে। কিন্তু এভাবে চলতে দেয়া হবে না। আমাদের প্রধান লক্ষ্য সবখানে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা। সে লক্ষ্যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে আমরা নতুন পদ্ধতি আনছি। পিয়ার ইন্সপেকশন (সমজাতীয় পরিদর্শন) নামে এই নতুন ব্যবস্থা আজ উদ্বোধন করা হচ্ছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, জাল সনদে চাকরি নেয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র আরও ভয়াবহ। তারা যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করেছেন সেখানেই এ ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরও ২১ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানেও নানা ধরনের অনিয়ম -দুর্নীতির তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আট হাজার ৬৯৮ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, জাল সনদে নিয়োগ এবং নানা ধরনের অনিয়মের তদন্ত রিপোর্টের সারসংক্ষেপ তৈরি হয়েছে। এ প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়েছে। কমিটির আগামী বৈঠকে এটি উপস্থাপনের সম্ভাবনা আছে।
সূত্র ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানায়, শিক্ষার মানসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসরণ, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, সরকারি অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার অনুকরণে ১৯৮০ সালে ডিআইএ প্রতিষ্ঠা করে সরকার। এ সংস্থার তদন্তে এখন পর্যন্ত পাঁচ ধরনের সনদ জাল করার ঘটনা বেশি ধরা পড়েছে। এগুলো হচ্ছে- নিবন্ধন পরীক্ষা, কম্পিউটার শিক্ষা, লাইব্রেরিয়ান, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং বিএড-এমএড সনদ। এছাড়া একাডেমিক ভুয়া সনদও পাওয়া যাচ্ছে। দারুল ইহসান, উত্তরাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত ক্যাম্পাস থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির ভুয়া সনদ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জাল সনদে চাকরি নেয়ার অভিযোগ উঠছে। ১৭ মে পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ৮২টি, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ১১টি, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ১০৯টি এবং খুলনা ও বরিশালে ৬৬টি জাল সনদ ধরা পড়েছে। গত ৫ মাসে আরও ৯৫টি জাল সনদধারী শিক্ষককে তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির জন্য তৈরি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত ডিআইএ ৮৬৯৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, নিরীক্ষা ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন তৈরি করে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২২৫টি প্রতিবেদন নিষ্পত্তি করে মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে জাল সনদে নিয়োগ পেয়েছেন ৩৬৩ শিক্ষক। তারা দুর্নীতির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত হয়েছেন। এসব শিক্ষক সরকারি বেতনের অংশ হিসেবে ১০ কোটি ৩২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৬৫ টাকা তুলে নিয়েছেন। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো (৮৬৯৮টি) কেনাকাটা, সংস্কার কাজ এবং ভুয়া এমপিওসহ বিভিন্ন খাত দেখিয়ে রাষ্ট্রের ১৫৭ কোটি ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার ৬০৩ টাকা লোপাট করে। এই দুই খাতে লোপাট করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা।
জানা গেছে, যে কোনো তদন্ত শেষে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে। এসব ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় বেশির ভাগ প্রতিবেদনই ফাইল বন্দি করে রেখেছে। যেসব বিষয় নিষ্পত্তি হয়, তার অধিকাংশই ‘রফা’ করে ছেড়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এর পেছনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) এবং ডিআইএ’র একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত।
এ প্রসঙ্গে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক মফিজউদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘আইনত আমরা সুপারিশকারী প্রতিষ্ঠান। অনিয়ম-দুর্নীতি ধরে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করে থাকি। ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের। তাই প্রতিবেদন নিষ্পত্তি নিয়ে কথা বলার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে আইন-কানুনের মধ্যে থেকেই আমাদের প্রতিবেদন দিতে হয়। জাল সনদের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় কথিত (সনদ) ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রত্যয়ন পাওয়ার পর। সুতরাং আমাদের প্রতিবেদন শতভাগ সঠিক। আর যদি আমরা ভুল প্রতিবেদন দিয়ে থাকি, তাহলে তার দায়ে আমাদের বিরুদ্ধেও মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
মন্ত্রণালয়ের সভা উত্তপ্ত : জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার এমন অনিয়ম-দুর্নীতি এবং রহস্যজনকভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পার করে দেয়া নিয়ে ১ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় উত্তপ্ত আলোচনা হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। যুগ্মসচিব (মাধ্যমিক) রুহী রহমান বিষয়টি উত্থাপন করে বলেন, এমপিও লোপাট নিয়ে ডিআইএ যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, তা ত্রিপক্ষীয় সভা ছাড়াই নিষ্পত্তি করা হয়। এ নিয়ে নানা অভিযোগ আমরা শুনে থাকি। যেহেতু আমরা (তার শাখা) এমপিও দিই, তাই আমাদের ছাড়া অভিযোগ নিষ্পত্তি করা উচিত নয়। তার এই বক্তব্যের জবাব দিতে ওঠেন সংশ্লিষ্ট শাখার উপসচিব অজিত কুমার। তখন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলা হয়, ‘আপনি এসেছেন দু’মাস। আপনি কী করে আপনার শাখাকে সততার সনদ দিচ্ছেন?’ জানতে চাইলে সভায় বিষয়টি আলোচিত হওয়ার কথা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে নিশ্চিত করেছেন রুহী রহমান।

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2015/10/APORADHER-DAYRE-THEKE2.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2015/10/APORADHER-DAYRE-THEKE2-300x300.jpgসুরুজ বাঙালীজাতীয়
বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় জাল সনদ দিয়ে ৩৬৩ শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের শনাক্ত করেছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর (ডিআইএ)। একই সঙ্গে ৮ হাজার ৬৯৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারের ১৫৭ কোটি টাকা লোপাটের তথ্যও চিহ্নিত করে তারা। এসবের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে সংস্থাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে...