90289_thumb_f3
জাতীয় ঐক্যের ১১ দফা সনদ ঘোষণা করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে গণফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ সনদ ঘোষণা করেন। ঘোষিত ঐক্য সনদে সুষ্ঠু নির্বাচন
, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এ সময় ড. কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১১ দফার জাতীয় ঐক্যের এই সনদ। এটি বাস্তায়নে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। এই ঐক্যের প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে। বাধা এলে তা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। গণফোরামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ম শফিউল্লাহ জাতীয় সনদ পাঠ করেন। ঐক্যের সনদ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বলা হয়, জাতি ইতিহাসের এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নীতি-আদর্শ বহির্ভূত রুগ্‌ণ রাজনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হয়। দুর্নীতি আজ সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি সংবিধানের প্রতি অনুগত হই এবং ত্রিশ লাখ শহীদ ও আত্মত্যাগী নেতৃবৃন্দের নীতি-আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত হই তবে আমাদের ওপর তাদের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের এখনই সময়। আমাদের আত্মত্যাগী নেতৃবৃন্দের নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধকে আজ আঁকড়িয়ে ধরতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে অস্ত্র ও পেশিশক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও দলকে নিয়ন্ত্রণ করার কারণে সংসদীয় গণতন্ত্র আজও অকার্যকর থেকে যায়। এ প্রেক্ষাপটে আরও বলা হয়, সুস্থ রাজনীতি ও কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। যা একটি স্থিতিশীল সমাজ,পরিচ্ছন্ন সরকার, আইনের শাসন ও মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেবে। সে লক্ষ্যে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে এ জাতীয় ঐক্যের সনদ ঘোষণা করা হচ্ছে।
সনদে বলা হয়েছে, সমগ্র জাতি আজ পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ। যে পরিবর্তনের মাধ্যমে জনগণের নিরাপত্তা, সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। ক্ষমতার মালিক জনগণ তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। কেবলমাত্র কালো টাকা, সন্ত্রাস ও সশস্ত্র ক্যাডারমুক্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ সৎ, যোগ্য ও কার্যকর জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে। আর এ ধরনের নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ। বহুদলীয় গণতন্ত্রে অবশ্যই দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় ও জনস্বার্থে কাজ করতে হবে। দলগুলোকে অবশ্যই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মান ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতে হবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মের অপব্যবহারের মাধ্যমে চরমপন্থা, অসহিষ্ণুতা, সন্ত্রাসবাদ ও বৈষম্যমূলক আচরণের কোন স্থান আমাদের সমাজে থাকবে না। সংবিধান অনুযায়ী আইনের প্রতি অনুগত থেকে জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
যথেচ্ছা গ্রেপ্তার, বিনা বিচারে আটক, আটকাবস্থায় নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করে না। সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী সুরক্ষিত মানবাধিকারের প্রতি অবশ্যই সকলকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত রাখতে হবে। রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্বাহী বিভাগের যে কোন প্রভাব থেকে মুক্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সকল জনগণের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও জীবিকা নির্বাহের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে এমন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে যেন জাতীয় সম্পদ ও মানবসম্পদকে সমন্বিত করে জাতীয় অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করা যায়। সনদ ঘোষণার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ড. কামাল। এ সময় দেশে বর্তমানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে যে কোন আন্দোলন পরিচালনায় বড় সমস্যা হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকা। আশার খবর হচ্ছে, আইসিটি আইন নিয়ে সংবাদপত্রের সম্পাদকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সবাই এই আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। আশা করি তারা দেশ নিয়েও তাদের দায়িত্ব পালনে সোচ্চার হবেন। তাহলে আর ৫৭ধারা থাকবে না।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ড. কামাল বলেন, ঝুঁকিতো আমি সারাজীবন নিয়েছি। এবার ১১ দফা জোরদার করতেও আমি ঝুঁকি নেব। কোন পদ্ধতিতে নতুন নির্বাচন চান এমন প্রশ্নের উত্তরে কামাল হোসেন বলেন, জনগণের কাছে যাব। তারা যেভাবে বলবে, সেভাবেই নির্বাচন হবে। সনদ কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ১১ দফা নিয়ে আমরা জনগণের কাছে যাব। গণসংযোগ, গণজাগরণ ও জাতীয় ঐক্য গড়ব। জনগণ যে পদ্ধতিতে বলবে সেই পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। কামাল হোসেন বলেন, সবাইকে আহ্বান জানাই, দেশের রোগ চিহ্নিত করেছি। মা যদি অসুস্থ হয়, যোগ্য সন্তান তা গোপন করবে না। যেসব বিষয় নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন সেগুলো রোগ। কামাল হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্ন রেখে বলেন, মানুষ পিটিয়ে মারা রোগ কি না? নিজেই উত্তরে বলেন, অবশ্যই রোগ। এরপর তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা আমাদের মাকে রোগমুক্ত দেখতে চাই। রোগকে অস্বীকার করলে হবে না। এজন্য কার্যকরভাবে আমাদের কাজ করতে হবে। তিনি সংবাদপত্রের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেন দেশে এখন মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। সংবাদপত্রের মালিকরা এজন্য আজ বিবৃতিও দিয়েছেন। আপনি মত প্রকাশের জন্য কখনও বাধাগ্রস্ত হয়েছেন কি না- জানতে চাইলে ড. কামাল বলেন, মাস দু-এক আগে আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অনুমতি পাইনি। এজন্য তিনবার হাইকোর্টে রিট পিটিশন করতে হয়েছে। এরপরও আমাদের সভা-সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারের উদ্দেশে ড. কামাল বলেন, ধরে নিচ্ছি আপনি নির্বাচিত। তাই বলে আপনি যা খুশি করতে পারেন না। হঠাৎ করে মনে হলো দাম বাড়াবেন, আর বাড়ালেন। এটা হতে পারে না। তিনি সরকারকে প্রশ্ন রেখে বলেন, তোমরা দাবি কর, তোমরা আমাদের প্রতিনিধি। তোমরা কিভাবে আমাদের প্রতিনিধি হলে? তোমরা নাকি আদিষ্ট হয়ে নীতিনির্ধারণ কর, আইন পাস কর। কার আদেশ তোমরা পালন করছ?
ড. কামাল বলেন, দেশের মালিক আমরা। মালিক হয়েও আমরা অসহায়, নিষ্ক্রিয়। মালিক হয়ে এখন আমাদের চিন্তা করতে হবে, আমরা কি আমাদের বাবা-মার সম্পত্তি হারাব? না কি মালিকানা রক্ষার জন্য যা কিছু করা দরকার, তাই করব। তিনি সংবাদ সম্মেলনের শেষে বলেন, আমাদের মূল কথা হলো- ঐকমত্য গড়ে তুলতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে ঐক্য হয়েছিল সেই ঐক্যের কথাই তুলে ধরতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন কি ছিল? স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু? যারা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তারা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন, অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। আমরা হতাশ হতে পারি না। যে পরিস্থিতি এসেছে আমরা তা মোকাবিলা করেছি। এবারও করবো। ড. কামাল জানান, জনগণের মতামত নেয়ার জন্য ১১ দফা জাতীয় সনদ পেশ করা হলো। সনদ বাস্তবায়নে জনগণের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গণফোরাম কাজ করবে। এক মাস পরে জনগণের মতামত প্রকাশ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ, ফরোয়ার্ড পার্টির সভাপতি আ ব ম মোস্তাফা আমীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নৃপেন পোদ্দারজাতীয়
জাতীয় ঐক্যের ১১ দফা সনদ ঘোষণা করেছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে গণফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ সনদ ঘোষণা করেন। ঘোষিত ঐক্য সনদে সুষ্ঠু নির্বাচন , গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। এ...