1438077457

দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের একদল সুখী ছেলে ঘুরে বেড়ায় সবখানে—নদী, সাগর, পাহাড় কিংবা গহীন অরণ্যে। সুযোগ পেলেই ছুটে চলে নিসর্গের সৌন্দর্যমণ্ডিত কোলে। তেমনি এক সুবর্ণ সুযোগে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম নীল আসমানের সাথে পাহাড়ের মিতালি নিয়ে গর্বিত খাগড়াছড়ির পথে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা এক বন্ধুর মাধ্যমে আগে থেকেই হোটেলের রুম বুকিং করা ছিল, তাই কোনো ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই সোজা রুমে গিয়ে উঠলাম। অতঃপর দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের ফেস্টুন নিয়ে সিএনজিতে চেপে অপরূপ সৌন্দর্যের রি-ছাং ঝরনার পানে ছুটলাম। সিএনজি তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত দুজন নিয়ে সর্বোচ্চ গতিতে ভোঁ ভোঁ শব্দ তুলে পাহাড়ি পথে ছুটছে। দু’পাশে নজরকাড়া প্রকৃতি, মাঝে পিচঢালা উঁচু-নিচু পথ, কখনো কখনো মনে হয় আরেকটু সামনে এগোলেই হয়তো নীলাভ আকাশ ছুঁয়ে দেবে আমাদের, তবে আকাশের পরশ না পেলেও আলু টিলার মোড়ে মেঘের ভেলার সাথে দারুণ এক সাক্ষাত্ হয়েছে। সে এক অপার্থিব অনুভূতি, অজানা শিহরণ! শেষ বসন্তে পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় পৌঁছে যাই রি-ছাং ঝরনার কাছাকাছি। সিএনজি আর যাবে না। শুরু এখন পাহাড়ি পথে পায়ে হাঁটা। কখনো উঁচু আবার কখনো নিচু এভাবে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৌঁছতে হবে জলধারার কাছে। আগের দিন তৈদু দেখতে গিয়ে সারা দিন ট্র্যাকিং করার কারণে শরীর কিছুটা ক্লান্ত ছিল, তারপরেও প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে সেদিন কোনো কষ্টই কঠিন মনে হয়নি। প্রায় চল্লিশ মিনিট চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাজির হলাম দৃষ্টিনন্দন ঝরনাটির সামনে। বিশাল জলরাশি অবিরাম ধারায় গড়িয়ে পড়ছে তার নিয়মিত ছন্দে। রি-ছাং হলো মারমা শব্দ। ‘রি’-এর বাংলা মানে হলো পানি আর ‘ছাং’ হলো গড়িয়ে পড়া। আশ্চর্য! নামের সঙ্গে ঝরনার বৈশিষ্ট্যের হুবহু মিল রয়েছে।

পাথুরে পাহাড়ের মাঝে হৈ-হুল্লোড় করে রি-ছাং ঝরনার পানিতে নিজেদের সমর্পণ করি। প্রচণ্ড গতিতে প্রায় ষাট ফিট উপর থেকে পানি পড়ার রিমঝিম শব্দ। দেশের অন্যান্য ঝরনার তুলনায় এই ঝরনার বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পর্যটকেরা অত্যন্ত নিরাপদে এর জলে নিজেকে মন ভরে ভিজাতে পারে। কেউ কেউ শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে স্লিপও খেতে পারবে! আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিজছি। ভেজার স্বাদ যেন মিটছেই না, সাথে অসংখ্যবার স্লিপ। শেষে দেখি থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আন্ডার গার্মেন্টসসহ ছিঁড়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ভেজার পর এবার দে-ছুটের স্বভাবসুলভ আচরণ—ঝরনার পানির উেসর দিকে পা বাড়ানো। পিচ্ছিল পথ আর লতাগুল্ম ছাড়িয়ে এগিয়ে যাই উপরের দিকে। একসময় উেসর মুখে এসেও যাই, তবে সে পথ ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু আমরা পেয়েছি মহা আনন্দ। পানির উেসর মুখে গিয়ে তো আমাদের চোখ কপালে। দারুণ! কত ঝরনারই তো উত্স দেখেছি কিন্তু এমন আকৃতির আর একটিও কোথাও দেখিনি। প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে যেন সুইমিংপুল। ইচ্ছে হলে সাঁতারও কাটা যাবে। চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো একবার, সম্পূর্ণ বুনো পরিবেশে হাজার ফিট উপরে সাঁতার কাটতে কেমন লাগবে আপনার? খোশ মেজাজে সাঁতার কাটলাম। এ জনমে যতগুলো ঝরনায় দেহ-মন ভিজিয়েছি, তার মধ্যে সবচেয়ে আনন্দময় এবং নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে প্রকৃতির এই রহস্যময় সৃষ্টি রি-ছাং ঝরনা। আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ি বৃক্ষের ছায়া, ঘন জঙ্গলের বুনো গন্ধ, অচেনা পাখির মিষ্টি সুর ভ্রমণ পিপাসুদের মন ছুঁয়ে যায়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি একটু নজর দেয় তাহলে আমাদের প্রকৃতির কন্যা রি-ছাং ঝরনা ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য হয়ে উঠবে এক অনবদ্য বিনোদন মঞ্চ।

পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা স্বকণ্ঠে জনপ্রিয় সেই গানটি গেয়ে উঠি, ‘ঘরছাড়া এক সুখী ছেলে, আনমনে আজ এই ক্ষণে। চলে গেছে দূরে কোথাও, ঠিকানাগুলো ছিঁড়ে ফেলে’। প্রথম লাইনটি দে-ছুটের জন্য প্রযোজ্য হলেও শেষের লাইনটির সাথে আমাদের সম্পর্ক নেই। কারণ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা বন-বাদাড়ে ভ্রমণের পাশাপাশি নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে থাকে। বন্ধুরা ছুটে যান অজানা এক ভালোলাগার মায়াবী সৌন্দর্যের হাতছানি রি-ছাং ঝরনার পানে।

তাহসিনা সুলতানালাইফ স্টাইল
দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের একদল সুখী ছেলে ঘুরে বেড়ায় সবখানে—নদী, সাগর, পাহাড় কিংবা গহীন অরণ্যে। সুযোগ পেলেই ছুটে চলে নিসর্গের সৌন্দর্যমণ্ডিত কোলে। তেমনি এক সুবর্ণ সুযোগে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম নীল আসমানের সাথে পাহাড়ের মিতালি নিয়ে গর্বিত খাগড়াছড়ির পথে। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা এক...