বরিশাল অফিস । মহানগর প্রতিনিধি
টেলিনর নামের আন্তর্জাতিক কোম্পানি, বাংলাদেশে যাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। টেলি-নরের ব্যবসা রয়েছে বিশ্বের ১৬টি দেশে। বাংলাদেশের মেধাবী কর্মীরা নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রামীণফোনো চাকরি পেলেও শেষ পর্যন্ত ঐ চাকরিই তাদের অনেকের মৃত্যু ডেকে এনেছে। খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।
প্রায় ১৫ বছরের চাকরি জীবনে গ্রামীণফোনের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অফিস সহকারী, ড্রাইভার, টেকনিশিয়ানরা কেউ কেউ মরে বেঁচে গেলেও তাদের স্ত্রীরা সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করছে। বেঁচে থাকা অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। পঙ্গু জীবন নিয়ে গ্রামীণফোনের এসব কর্মীরা মৃত্যুর প্রহর গুনলেও এই প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতনদের মন গলছে না বলে জানান একাধিক ভূক্তভোগী।

কর্মীদের অভিযোগ, তাদের এ দীর্ঘ কর্মজীবনে উর্ধ্বতন অসংখ্য কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়েছে। কিন্তু নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত ৭টি মামলার রায় কর্মীদের পক্ষে থাকলেও তারা গ্রামীণফোন থেকে কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি পর্যন্ত পাচ্ছেন না। অথচ প্রয়োজনের সময়ে মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনরের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিদেশ পর্যন্ত নিয়ে দিন-রাত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়ে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতে কুণ্ঠা বোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

গ্রামীণফোনে ১৬ বছর চাকরি করে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণকারী শাহজাহান ইসলাম সাজু’র স্ত্রী সীমা বেগম দু’কন্যা সন্তান নিয়ে এখন দিশেহারা। সীমা বেগম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তার স্বামী ১৯৯৯ সালের আগস্ট মাসে গ্রামীণফোনে গাড়ি চালক পদে যোগদান করেন। প্রতিষ্ঠানের তত্কালীন কর্নধাররা তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনরের মাধ্যমে পাকিস্তানে পরিবারসহ এক বছরের জন্য নিয়ে যায়। সেখানে এক বছর দায়িত্ব পালন শেষ পুনরায় গ্রামীণফোনে যোগদান করে দিন-রাত পরিশ্রম করলেও স্ট্রোকজনিত কারণে মৃত্যু হলে কোন ধরণের সহযেগিতা পাওয়া যায়নি গ্রামীণফোন থেকে। সীমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী দিন-রাত গ্রামীণফোনে পরিশ্রম করলেও ১৬ বছরের চাকুরীজীবনের সামান্য বেতনে জমা তো দূরের কথা ধার-দেনায় জর্জরিত ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বামীর মৃত্যুর পর দু’ মেয়েকে নিয়ে অনাহারে কাটলেও কর্মস্থলের কর্মকর্তাদের কাছে ধর্না দিয়েও একটি পয়সাও মেলেনি। বরং গত বছরের নভেম্বরে মৃত্যুকালীন সময়ের কিছু টাকা দেয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে তাকে বিদায় দেয়া হয়। পরবর্তীতে টাকার বিষয়ে কথাই বলেন না কর্মকর্তারা।

একই অবস্থা অপর চালক গোপালগঞ্জের পারভেজ মোল্লার পরিবারে। মৃত পারভেজের স্ত্রী নুপুর বেগম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, ২০০২ সালে তার স্বামী গ্রামীণফোনে যোগদান করেন। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ তিনি ঢাকাতে কর্মরত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার লাশ গ্রামের বাড়িতে আনার জন্য গ্রামীণফোনের নিজস্ব এ্যাম্বুলেন্সটি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। সহকর্মীরা এ নিয়ে দাবি তুললেও গ্রামীণফোন কর্মকর্তারা তাতে কর্নপাত করেননি। পরবর্তীতে তার লাশ ভাড়া করা এ্যাম্বুলেন্সে পরিবহন করা হয়।

নূপুর বেগম জানান, তার স্বামীর মৃত্যুর পর আর গ্রামীণফোন থেকে কোনো যোগাযোগ না করা হলেও দু’মাস পূর্বে ঢাকার বসুন্ধরা থেকে গ্রামীণফোনের সুপারভাইজার পরিচয় দিয়ে জসিম ফোন করে তাকে যেতে বলে। তিনি সেখানে গেলে তার স্বামীর কিছু টাকা পাবেন বলে একটি কাগজে স্বাক্ষর রেখে দেন এবং বলে দেন মৃত ব্যক্তির নামে কোনো মামলা চলে না তাই তারা যে টাকা দেবেন তা পরে জানিয়ে দেয়া হবে। নুপুর বেগম জানান, ২ ছেলে ২ মেয়ে নিয়ে তিনি গোপালগঞ্জের এ বাড়িতে অনাহারে দিনযাপন করছেন। সেই স্বাক্ষর নেয়ার পর থেকে আর কেউ যোগাযোগ করেনি।

গ্রামীণফোনে কর্মরত থেকে মৃত্যুবরণকারী অপর গাড়ি চালক সোলায়মানের স্ত্রী বরিশালের মুলাদীতে বর্তমানে বসবাসরত মারুফা বেগম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, তার স্বামী ২০০৬ সালে গ্রামীণফোনে যোগদান করেন এবং ২০১৬ সালের ৩ জুলাই সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় মানসিক অত্যাচারে তার স্ট্রোক হয়। এরপর দু’মাস বারডেম হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। সহায়-সম্বল বিক্রি করে ৪ লাখ টাকা দিয়ে তার চিকিত্সা ব্যয় মেটানো হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। বর্তমানে মুলাদীতে এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তিনি অন্যের বাসা-বাড়িতে কাজ করে পেট চালাচ্ছেন।

গ্রামীনফোনে কর্মরত ইউলিস সরকার ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, ১৩ বছরের চাকরি জীবন এমন অভিশপ্ত হয়ে যাবে তা তিনি কখনোই বুঝতে পারেননি। ২০১৬ সালে কুমিল্লাতে চাকরিরত অবস্থায় তার স্ট্রোক হয়। ঢাকায় চিকিত্সারত থাকাকালে ২ মাস তাকে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে বলেন চিকিত্সকরা। কিন্তু গ্রামীণফোনের কর্মকর্তারা তাকে ১০ দিনের বেশি হাসপাতালে থাকলে চাকরি হারাতে হবে বলে জানিয়ে দেন। অবশেষে চাকরি রক্ষার্থে হাসপাতালের বিছানা ত্যাগ করে অসুস্থ অবস্থায় কাজ করতে হচ্ছে। চিকিত্সায় কোন সহযোগিতা দূরের কথা বর্তমানে তাকে স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।

গ্রামীণফোন লিমিটেড শ্রমিক ইউনিয়ন বি-২১৬৪’র (যা হাইকোর্টে স্থগিত) সাংগঠনিক সম্পাদক কাইয়ুম শেখ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, কর্মরত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ৬জনের পরিবারের সদস্যরা আজ না খেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। তাদের স্ত্রীরা গ্রামীণফোনের অফিসারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে শূন্য হাতে ফিরেছেন। এখন সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চেয়তার মধ্যে রয়েছেন। কর্মরতরাও তাদের কোন সাহায্য করতে পারছে না। কারণ ৪ বছর তাদের বেতন বাড়েনি। যে কোন সময় চাকরি হারানোর ভয় রয়েছে। মামলার খরচ দিতে হয় বেতন থেকে। চোখের সামনে সহকর্মীদের স্ত্রী-সন্তানরা না খেয়ে থাকলেও আর্থিক সক্ষমতার অভাবে তাদের তা সহ্য করতে হচ্ছে। কাইয়ুম শেখ বলেন, সহকর্মী গোপালগঞ্জের পারভেজ মোল্লার মৃত্যুর পর তারা দায়িত্বরত গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা জিএম ট্রান্সপোর্ট আসাদুজ্জামান আসাদ, লিড ম্যানেজার আনিছুর রহমানের কাছে প্রতিষ্ঠানের এ্যাম্বুলেন্সটি লাশ বহনের জন্য চাইলে তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মৃত্যুতেও তাদের পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা পাননি কোনো কর্মী। তিনি জানান, বি-২১৬৪’র ৬জনসহ মোট ১৬জন কর্মী সম্প্রতি গ্রামীণফোন কর্মকর্তাদের মানসিক অত্যাচারে মৃত্যুবরণ করেছেন। অসুস্থ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণকারীদের সংখ্যাও কম নয়। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই কর্মরত সকলের একই ভাগ্যবরণ করতে হবে বলে শ্রমিক-কর্মচারীদের শঙ্কা।
খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের। –

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2018/01/746.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2018/01/746-300x300.jpgশিশির সমরাটশেষের পাতা
বরিশাল অফিস । মহানগর প্রতিনিধি টেলিনর নামের আন্তর্জাতিক কোম্পানি, বাংলাদেশে যাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোন। টেলি-নরের ব্যবসা রয়েছে বিশ্বের ১৬টি দেশে। বাংলাদেশের মেধাবী কর্মীরা নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রামীণফোনো চাকরি পেলেও শেষ পর্যন্ত ঐ চাকরিই তাদের অনেকের মৃত্যু ডেকে এনেছে। খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের। প্রায় ১৫ বছরের...