05_262961
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি নিজেও গুম হয়ে যেতে পারেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরাও জানি না কত দিন এভাবে বেঁচে থাকতে পারব। আমাদেরও যে মেরে ফেলা হবে না, তা আমরা বলতে পারি না।’ দেশে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো সরকারের নির্দেশেই হয়েছে, এমন অভিযোগ করে তিনি এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য জাতিসংঘকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বাংলাদেশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ অনুষ্ঠানে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে এ আয়োজন করা হয়। ২০০৯-১৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার দলের ২৬ নেতাকর্মীর পরিবারের সদস্যরা গতকাল উপস্থিত ছিল।
খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার নেই। কারো কথা বলার অধিকারও নেই। কেউ কোনো অনুষ্ঠানও করতে পারবে না। যারা জোর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে আছে, যারা মিথ্যা কথা বলতে পারে, কেবল তাদেরই অধিকার আছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের অনুভূতির প্রতি একাত্ম হয়ে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সরকার কখনো গুমের ঘটনার সুষ্ঠু কোনো তদন্ত করবে না। আমি শুধু স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে পারি, আশ্বাস দিতে পারি, এর বেশি কিছু আমাদেরও করার নেই।
আমরা জানি না, আমরা কী রকম থাকব, কখন গুম-খুন হয়ে যাব না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধু আল্লাহ তাআলা জানেন। শুধু মানুষের আস্থার ওপর আমরা ভরসা করে চলি। আমাদের বিশ্বাস, এ দেশের মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছে।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাস ও গুম-খুনের ঘটনা ঘটেছে। আমরা জানি, সরকারের নির্দেশ-আদেশ ছাড়া এসব কাজ র‌্যাব-পুলিশ করতে পারে না। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের অনেকে আজ আন্তর্জাতিক গুম দিবসে সরকারের কাছে দাবি করেছেন, তদন্ত করে তাদের (গুমের শিকার ব্যক্তিদের) খুঁজে বের করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি জানি, সরকার কোনো দিনও তদন্ত করবে না। তাদের অধীনে কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হবে না। তাই আমি দাবি করছি, জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক তদন্ত করতে হবে। দেশে যাঁরা নিরপেক্ষ আছেন তাঁদের নিয়ে ওই তদন্ত করতে হবে।’
গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কেউ পার পাবে না হুঁশিয়ারি দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘একদিন না একদিন এসবের বিচার হবেই হবে। যারা অন্যায় করেছে, অপরাধ করেছে, তাদের প্রত্যেকের শাস্তি হবেই। স্বজনহারারা অন্তত জানতে পারবেন তাঁদের ছেলে গুম হয়েছিল, তাদের কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল। স্বজনরা অনেকে বলেছে, যদি ডেডবডিটা পেত, তাহলে জিয়ারত করতে পারত। সে জন্য আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিলে অবশ্যই এই কাজটা করব। প্রত্যেক পরিবারকে সহযোগিতা করব।’
বছরের শুরুতে বিএনপি জোটের আন্দোলনের সময় নাশকতার জন্য ক্ষমতাসীন দলকে দায়ী করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা বানোয়াট মামলা দেওয়া হয়েছে। তারা নাকি পেট্রলবোমা মেরেছে? আসলে আন্দোলনকে ভিন্নপথে নিতে ও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে সরকার। পুলিশও নিজেরা স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছে, আমরাও (পুলিশ) ওই সব কাজ করেছি। এর রেকর্ড আছে।’ ক্ষমতাসীন দলের অনেকে পেট্রলবোমাসহ আটক হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আহমেদ আজম খান, যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, হাবিবুর রহমান হাবিব, খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান, সাংবাদিক শফিক রেহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে ‘অনন্ত অপেক্ষা’ নামে ১৩ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এ সময় স্বজনরা প্রিয়জনের ছবি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। খালেদা জিয়াকেও অশ্রুসজল দেখা যায়। তিনি গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন ও তাদের খোঁজ-খবর নেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির নিখোঁজ সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদি লুনা, সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসী, সানজিদা ইসলাম, হুমায়ুন কবীর পারভেজের স্ত্রী শাহনাজ আখতার, যুবদলের ইকবাল মাহমুদের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম, স্বেচ্ছাসেবক দলের এ এম আদনান চৌধুরীর বাবা রুহুল আমিন চৌধুরী, ছাত্রদলের নিজামুদ্দিন মুন্নার বাবা শামসুদ্দিন, মাহবুব হাসান সুজনের স্ত্রী তানজিনা আখতার, খালিদ হাসানের স্ত্রী সৈয়দা শাম্মী সুলতানা, মাহফুজুর রহমান সোহেলের বাবা শামসুর রহমান, মাজেদুল ইসলাম রাসেলের বোন লাবনী আখতার, সেলিম রেজা পিন্টুর বোন রেহানা বানু মুন্নী প্রমুখের স্বজনরা খালেদা জিয়ার কাছে তাঁদের মর্মস্পর্শী কষ্টের কথা তুলে ধরেন।
জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক : বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে গতকাল বৈঠক করেছেন খালেদা জিয়া। গুলশানে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। রাত ৮টায় খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে বৈঠকে জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রাত ৯টা এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জোটের বৈঠক চলছিল।
গুলশান অফিস সূত্র জানায়, বৈঠকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জামায়াত ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুল হালিম, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) ফজলে রাব্বী চৌধুরী, ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) শফিউল আলম প্রধান, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী) চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি এইচ এম কামরুজ্জামান খান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

নৃপেন পোদ্দারজাতীয়
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি নিজেও গুম হয়ে যেতে পারেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরাও জানি না কত দিন এভাবে বেঁচে থাকতে পারব। আমাদেরও যে মেরে ফেলা হবে না, তা আমরা বলতে পারি না।’ দেশে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো সরকারের নির্দেশেই হয়েছে, এমন অভিযোগ করে তিনি এ ব্যাপারে...