93622_thumb_f3
ক্ষমতার পৃথকীকরণের সাংবিধানিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা প্রয়োগের ভারসাম্য প্রায়শই বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই তিনটি বিভাগের ক্ষমতা ও কাজের ভারসাম্য আনা জরুরি বলে মনে করছেন উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। এ লক্ষ্যে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠক থেকে তারা এ দাবি জানান। পূর্ণ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের ব্যানারে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা ধারাবাহিক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করছেন। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর তারা একটি বৈঠকের আয়োজন করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকালের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সঞ্চালক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, নাগরিকদের বৈঠকে আলোচিত বিষয়বস্তু পরবর্তীকালে ভলিউম আকারে প্রকাশ করা হবে। নাগরিকরা দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সমস্যার একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান চান। এ বছরের শুরুতে দেশব্যাপী শুরু হওয়া সংঘাতের ফলে ব্যাপক জানমালের ক্ষতি হয়। সে পরিপেক্ষিতে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ গঠিত হয়। আমরা দেখেছি যে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো শুধু নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার আনয়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কথা হচ্ছে নির্বাচনী গণতন্ত্র। এটা প্রমাণিত হয়েছে ওই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ১৯৯১ সাল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়ে আসছে। কিন্তু এরপরও আরও কিছু করা দরকার। নির্বাচনে কেউ হারলে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। তাই শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, দুদক যদি সঠিকভাবে কাজ করে তাহলে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকে না। আমরা এই বিষয়টার দিকে নজর দেই না। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আজ ১২টা বিষয় চিহ্নিত করেছে। আমরা এসব বিষয়ে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে বলছি। কিন্তু কাজ করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। এ প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকট থাকলেও মৌলিক বিষয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ। তাই সকল সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হয়। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আমরা সমালোচনার জবাব দেই না। কারণ, এর প্রয়োজন মনে করি না। নাগরিক সমাজের সদস্যরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কাজ করেছেন। নিজেরা যেচে কারও কাছে তারা পদ চায়নি। আমাদের ডেকে পদ দেয়া হয়েছে। এখানে কারও স্বার্থের বিষয় নেই। আমরা ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে যে স্বাধীনতা পেয়েছি তা সমুন্নত রাখা আমাদের উদ্দেশ্য। বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এমএম শওকত আলী বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর বাইরে কোনভাবেই সম্ভব না। কোন কোন জায়গায় সংস্কার করা উচিত, করলে ভাল হবে, সুশাসনের জন্য সহায়ক হবে তা নাগরিকরা সুপারিশ করতে পারে। তিনি বলেন, একক রাষ্ট্রে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে খুব বেশি দূর নিয়ে যাওয়া যায় না। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। প্রাইভেটাইজেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা করলেই যে সুফল পাওয়া যাবে তা ঠিক না। রেগুলেটরি অথরিটিকে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। সকল সেক্টরে এ রকম অথরিটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রধান বিচারপতির একটি পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, আজকাল নতুন নতুন যেসব আইন হচ্ছে সেগুলো বিচার নিষ্পত্তিতে বাধা সৃষ্টি করছে কি না গবেষণা হওয়া দরকার। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রকৃতপক্ষে একটা দেশে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয় না যদি সেখানে অর্থের একটা স্বয়ংক্রিয় বণ্টন ব্যবস্থা না থাকে। এটা ভারতে আছে এবং ছয় দফা আন্দোলনে অন্যতম বিষয় ছিল যে আমাদের সম্পদ আমরা পাবো কি না। বাংলাদেশে এটা আলোচনায় আসে না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হলেও অর্থের বণ্টন সঠিকভাবে না হলে কোন লাভ হবে না। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আমরা এটা দেখতে পাই। পুলিশের কথা তো বলাই যাবে না। কারণ, এটা রাজনৈতিক হাতিয়ার। আর্থিক ক্ষমতাই হচ্ছে আসল ক্ষমতা। অর্থকে যদি কেন্দ্র থেকে বের করে আনা না যায় তবে ক্ষমতাকে বের করা যাবে না। জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী উন্নয়ন কাজে অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ কমিশন গঠন করার আহ্বান জানান তিনি। স্থানীয় সরকারে অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে কি না তা ক্ষতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারে এমপি সাহেবরা বসতে পারেন কি না এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট হওয়া দরকার। কোন অধিকার বলে তারা সেখানে বসবেন তার বৈধতা জানা দরকার। হাইকোর্টে থাকলে আমাদের আপিল বিভাগে যাওয়া উচিত। কারণ হিসেবে, জনগণ এই বিষয়ে তাদের কোন সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। প্রবন্ধে বিকেন্দ্রায়নের যৌক্তিকতায় বলা হয় ক্ষমতার ভারসাম্য, অধিকতর গণতন্ত্র, সমতা ও জনমুখী সেবা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, জনসম্পৃক্ততা, সমতায়ন, গণক্ষমতায়ন, স্বশাসন, সুশাসন এবং প্রশাসনিক ও অর্থব্যবস্থার দক্ষতার জন্য বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকতার কুফল উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, বোকারা ক্ষমতাকে ভাগাভাগি ও বিকশিত না করে মুষ্টিবদ্ধ করতে গিয়ে নিজেরাই নিজেদের ক্ষমতার কারাগারে বন্দি হয়ে যান। ক্ষমতা একটি যন্ত্রণাময় জাল। এখানে বেশি জড়িয়ে গেলে বের হওয়ার পথ সঙ্কুচিত হয়। অতি ক্ষমতা মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে। ক্ষমতার প্রতি মাদকতা ও উন্মাদনায় কিছু কিছু মানুষ পাগল হয়ে যায়। গ্রিক পৌরাণিক সাহিত্যে কিং মিডাসের স্বর্ণ অনুরাগের মতো। শেষ পর্যন্ত তাকে দেবতার স্পর্শমাত্র স্বর্ণ রূপান্তরের বর শাপে পরিণত হয়। ইতিহাসের অনেক মহানায়কের করুণ পরিণতি ক্ষমতার প্রতি অনুরাগ থেকেই সৃষ্ট। প্রবন্ধে বাংলাদেশের বিকেন্দ্রীকরণের কিছু দিক নির্দেশনা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকারের তিনটি বিভাগ বা অঙ্গকে ধরেই একটি বিকেন্দ্রায়ন নীতি রচিত হতে পারে। এক্ষেত্রে আইন, শাসন, ও বিচার বিভাগকে মূল কেন্দ্র নির্ধারণ করে কোথায়, কতটুকু, কার কাছে কিভাবে বিকেন্দ্রায়ন প্রয়োজন তা নির্ধারণ জরুরি। সংসদের ভেতরে ও বাইরে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্ন থাকে। এ বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সংসদের উচ্চ কক্ষ ও নিম্ন কক্ষ, দুটি কক্ষের সৃষ্টি এবং আইনবিভাগের অভ্যন্তরে ভারসাম্য আনয়ন, নির্দিষ্ট বা ন্যূনতম গণস্বাক্ষরে উত্থাপিত কোন বিষয় বিল আকারে সংসদে উত্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ বিল সংসদে পেশের পূর্বে জনমত যাচাই, সংবিধানের মৌলিক বিষয় সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট গ্রহণ, সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থাকে অধিক কার্যকর করা। নির্বাহী বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে বলা হয়, এর একাধিক স্তর ও বিন্যাস ভেবে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে অনেক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী এবং আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ক্ষমতা, কার্যক্রমের নবতর বিন্যাস নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। সচিবের কর্তৃত্বের একটি সুনির্দিষ্ট বলয় ও সীমারেখা থাকতে হবে। সচিব কখনও মন্ত্রীর কর্তৃত্বে বিলীন হয়ে যাবে না। বিচারব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহরে হাইকোর্টের বিশেষ কোন বেঞ্চ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া যায় কি না সেটি বিবেচনার দাবি রাখে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। প্রবন্ধে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কার ও অধিক দায়িত্ব ক্ষমতা অর্পণের জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনিপন্থায় ক্ষমতা চর্চা ও প্রয়োগে হস্তক্ষেপ না করা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে সরকারি দপ্তর, জনবল এবং অর্থসম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে স্থানীয় সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা, সেবা ব্যবস্থা প্রশাসনিক জবাবদিহি স্বচ্ছ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার সঞ্চালনায় বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অংশ নেন।

অর্ণব ভট্টএক্সক্লুসিভ
ক্ষমতার পৃথকীকরণের সাংবিধানিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা প্রয়োগের ভারসাম্য প্রায়শই বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই তিনটি বিভাগের ক্ষমতা ও কাজের ভারসাম্য আনা জরুরি বলে মনে করছেন উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ। এ লক্ষ্যে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার রাজধানীর...