02_271194
এবার জাহাজের কনটেইনারে পাওয়া গেল বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা- ভারতীয় রুপি। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা একটি জাহাজের কনটেইনারে এসব রুপি পাওয়া যায়। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কনটেইনারটি আটক করে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় রুপির পরিমাণ জানাতে পারেননি কাস্টমস কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, শহীদুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ‘ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র’ ঘোষণা দিয়ে একটি কনটেইনারে ১৬২ প্যাকেট পণ্য আমদানি করেন। ‘এমভি প্রোসপার’ নামের একটি জাহাজে করে গত ১৬ সেপ্টেম্বর কনটেইনারটি (টিসিকেইউ ৩২২৪৩১৯) চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। গতকাল সোমবার কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কনটেইনারটি জব্দ করে, যার রোটেশন নম্বর ছিল ২২৬৯/২০১৫। গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দরের ৮ নম্বর ইয়ার্ডে বন্দর ও কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কনটেইনারটি খুলে দেখেন। এ সময় কনটেইনারে থাকা চারটি প্যাকেটে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় রুপির সন্ধান মেলে। কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ১৬২টি প্যাকেটের বাকিগুলোতেও বিদেশি মুদ্রা থাকতে পারে। তবে মুদ্রাগুলো আসল না নকল, সে ব্যাপারে কাস্টমস কর্মকর্তারা এখনো কিছু জানাতে পারেননি। গত রাতে রুপি গণনার কাজও শুরু হয়নি, তবে বাকি প্যাকেটগুলোয় কী রয়েছে, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চলছিল।

বন্দর কর্মকর্তারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, আমদানিকারক শহীদুজ্জামান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোডের ফরচুন ট্রেড লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ব্যবহার করে কনটেইনারটি আমদানি করেছিলেন। কনটেইনারটি খালাস করার জন্য ফ্লাশ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের সিঅ্যান্ডএফ কম্পানিকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। গত রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কাস্টমস কর্মকর্তারা কনটেইনারের সব প্যাকেট তল্লাশি করছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ জানাতে পারেননি কাস্টমস কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (নিরাপত্তা) লে. কর্নেল আলমগীর কবির গত রাতে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘এখনো কনটেইনারের সব পণ্য অ্যাসেসমেন্ট চলছে। তাই উদ্ধার হওয়া মুদ্রার পরিমাণ এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।’

চট্টগ্রাম বন্দরের এক কর্মকর্তা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সরাসরি কোনো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে না। তাই দুবাইয়ের কোনো পণ্য চট্টগ্রামে আনতে হলে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর হয়ে আনতে হয়। পণ্যভর্তি কনটেইনারটি দুবাই থেকে ওই জাহাজে করে কলম্বো বন্দর হয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। কনটেইনারটি ২০ ফুট লম্বা।

চট্টগ্রাম শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মোকাদ্দেস ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, রবিবার কনটেইনারের ভেতর থাকা পণ্য বন্দরের ৮ নম্বর ইয়ার্ডের ‘এফ’ শেড থেকে খালাসকালে এসব ভারতীয় রুপির সন্ধান মেলে। একেকটি প্যাকেট দুই ফুট দৈর্ঘ্য এবং দুই ফুট প্রস্থের। এ রকম চারটি প্যাকেটে (কার্টনে) ১০০ রুপি সমমূল্যের বিপুল পরিমাণ নোট রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নোটগুলো আসল না নকল, তা এখনো যাচাই করা হয়নি।

কাস্টমস কর্মকর্তারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে আরো জানান, কনটেইনারের পণ্যগুলো কায়িক পরীক্ষা করে সরাসরি কাভার্ড ভ্যানে তুলে বন্দর থেকে সরবরাহ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলার সময়ই শুল্ক গোয়েন্দা দলের হাতে ধরা পড়ে।

সিঅ্যান্ডএফ ও কাস্টমস কর্মকর্তারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, পারসোনাল অ্যাসেট বা ব্যক্তিগত পণ্য সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানির নিয়ম রয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রবাসীকে বিদেশে কমপক্ষে পাঁচ বছর বসবাস করেছেন এমন কাগজপত্র জমা দিতে হবে। সেখানে ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী নিয়ে দেশে আসার পথে নির্দিষ্ট বিমানবন্দর বা স্থলবন্দরে সেই পণ্যের ঘোষণা দিতে হয় সরকারি ‘এ’ ফরমে। সেই সঙ্গে তাঁর পাসপোর্টের কপি, পণ্যের বর্ণনা বা প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লোডিং এবং পণ্য খালাসের জন্য ক্যাজুয়াল ভ্যাট কপি সংযুক্ত করে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এসব পণ্য বন্দর থেকে সরবরাহ নেওয়ার আগে বন্দরের ‘এফ’ শেডে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তা। কায়িক পরীক্ষার ভিত্তিতে শুল্ক কর কাস্টমসে জমা দিয়ে সেই পণ্য বন্দর থেকে খালাসের অনুমতি মেলে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেছেন, কাস্টমস ও বন্দরের একটি চক্র এসব ‘পারসোনাল অ্যাসেট’ পণ্য কম শুল্কে বন্দর থেকে ডেলিভারি করিয়ে দেওয়ার কাজ করে। কিন্তু কাস্টমসের ইতিহাসে এ ধরনের পণ্য আটক হয়েছে বলে আগে খুব একটা শোনা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী আমদানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য বন্দর থেকে এর আগেও নিয়মিত খালাস হয়েছে। বর্তমান চালানটি ধরা পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে- কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট শেডে বদলি হয়ে আসা নতুন কর্মকর্তাদের যোগদান। নতুন কর্মকর্তারা সেই চক্রের সঙ্গে বোঝাপড়ার আগেই চালানটি ধরা পড়ল শুল্ক গোয়েন্দা দলের হাতে। ধারণা করা হচ্ছে, শুল্ক গোয়েন্দা দল চালানটি আটক করতে না পারলে বন্দর থেকে ঠিকই বের হয়ে যেত।

এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে বিপুল পরিমাণ কোকেন ধরা পড়ার ঘটনায় দেশ-বিদেশে তোলপাড় পড়ে যায়।

সূত্র জানায়, কাস্টমস ও বন্দর থেকে এসব অবৈধ পণ্য ডেলিভারির কাজ করে থাকে কিছু অবৈধ সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান। মূলত তারাই অবৈধ চালান খালাসের পুরো বিষয়টির আর্থিক সমঝোতা করে থাকে। এই চালানের দায়িত্বে থাকা সিঅ্যান্ডএফ ফ্লাশ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ক্ষেত্রেও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী রিগ্যান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে জেনেছি, সেই সিঅ্যান্ডএফ আমাদের সংগঠনভুক্ত নয়। অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কোনো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অবৈধ কর্মকাণ্ড আমরা সমর্থন করিনি, করবও না। এ ক্ষেত্রেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’

চট্টগ্রাম কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার গিয়াস কামাল গত রাত সাড়ে ৯টায় তল্লাশির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত ছয়টি টিম প্রস্তুত রয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল হোসেন খান ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে কনটেইনার তল্লাশি কার্যক্রম শুরু হবে। কনটেইনারটিতে প্রচুর ব্যবহার্য পণ্য রয়েছে। কনটেইনারের দরজার সামনের দিকে ভারতীয় রুপিভর্তি কার্টনের খোঁজ মিলেছে। তবে সেখানে কী পরিমাণ মুদ্রা আছে তা পুরোপুরি তল্লাশি শেষে জানা যাবে। আশা করছি রাতের মধ্যে আমরা তল্লাশিকাজ শেষ করতে পারব।’

এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল হোসেন খান এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাস্টম হাউসে রাত ১১টার দিকে বৈঠকে বসেন। বৈঠকের পর তাঁদের বন্দরের ৮ নম্বর ইয়ার্ডের এফ শেডে কনটেইনার পরিদর্শনের কথা। এরপর কর্মকর্তারা পরবর্তী করণী বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে খবর পেয়ে রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রামে আসেন শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল।

বৈদেশিক মুদ্রা চোরাচালান রোধে আইনি ব্যবস্থা : বৈদেশিক মুদ্রা চোরাই পথে দেশে আনা বা দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার করা হলে দুটি আইনে মামলা হতে পারে। একটি হচ্ছে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন, অন্যটি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘন করলে এখন থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। পাশাপাশি জরিমানারও বিধান করা হয়েছে।

নৃপেন পোদ্দারপ্রথম পাতা
এবার জাহাজের কনটেইনারে পাওয়া গেল বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা- ভারতীয় রুপি। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা একটি জাহাজের কনটেইনারে এসব রুপি পাওয়া যায়। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কনটেইনারটি আটক করে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতীয় রুপির পরিমাণ জানাতে পারেননি কাস্টমস কর্মকর্তারা। জানা গেছে, শহীদুজ্জামান নামের এক...