89496_x5
ছোট্ট একটি অগোছালো কক্ষ। ভেতরে আবছায়া অন্ধকার ও ভ্যাপসা গন্ধ। চারদিকে ঝুলছে পোশাক। ইঁদুর ও তেলাপোকার অবাধ বিচরণ। দিনের বেলায় জ্বালিয়ে রাখতে হয় আলো। এরই মাঝে কেউ পড়ছে বই, কেউ গল্প করছে ফোনে। অন্যদিকে কেউ রান্নার আয়োজন করছে, কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউবা তৈরি হচ্ছে বাইরে যেতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই পলাশী এলাকায় অবস্থিত মেয়েদের একটি মেসের দৃশ্য এটি। এরকম অসংখ্য মেস রয়েছে এই এলাকায়। সেখানে ছোট ছোট একেকটি কক্ষে গাদাগাদি করে থাকেন ৮ জন। তাদেরই একজন জেসমিন আক্তার। পড়ছেন ইডেন কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে। হলে সিট না পাওয়ায় থাকছেন মেসে। জেসমিন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, অত্যন্ত কষ্ট করে থাকতে হয় মেসে। ২ রুম আর ডাইনিং সংবলিত একটি বাসায় এক রুমে থাকেন ৮ জন। পাশের রুমে থাকেন ৩ জন ছেলে। বাড়িওয়ালা তার ছেলেমেয়ে নাতিসহ ডাইনিংয়ে পার্টিশান দিয়ে কক্ষ বানিয়ে থাকেন। তার মধ্যে আবার নতুন দম্পতিও রয়েছে। ৮ জন মেয়ে, ৩ জন ছেলে ও ৬ জন ফ্যামিলি মেম্বারের জন্য টয়লেট মাত্র একটি। যারা সকালে কাজে বের হন তাদের সিরিয়াল ধরতে হয় ভোরেই। এরপরও সুযোগ পাওয়াটা যেন সৌভাগ্যের বিষয়। রুমগুলোতে কোন খাট বা চৌকি নেই। সবার শোবার ব্যবস্থা ফ্লোর। গণবিছানা। একটি মাত্র ট্রাঙ্কই মেয়েগুলোর সম্বল। ৮ জন মেয়ে দেশের ৮ প্রান্ত থেকে আসা। কথা-বার্তা, চালচলন, পোশাক, স্ট্যাটাসে প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। কারও সঙ্গে মিল নেই কারও। তার পরও তারা কিভাবে একসঙ্গে থাকেন? কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে ঢাকায় একটি কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে কর্মরত ঝিনাইদহের মাধুরী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, এটা অনেক কষ্টের বিষয়। কারও সঙ্গে কারও মানসিকতা মেলে না। একজন একটা বললে আরেকজন আরেকটা বলেন। এ নিয়ে প্রায় বিবাদ হয়। কিন্তু সেটা খুব স্থায়ী হয় না, ভুলে যান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী রাকা ইসলাম ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, প্রায়ই তারা গল্প আড্ডায় মেতে ওঠেন। বসে নাচগানের আসর। বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী নদী ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, কষ্ট যেমন আছে মজাও আছে তেমন। এতগুলো মানুষ একসঙ্গে থাকলে ঝামেলা তো একটু হবেই। কিন্তু যখন সবাই মিলে বেড়াতে যাই বা পিকনিকে যাই তখন অনেক ভাল লাগে।
এক চুলা ৮ রাঁধুনি: কক্ষের এক কোনায় বসে একটি করে পটল, আলু ও ঝিঙ্গা কাটছেন এক বুয়া। এতো অল্প তরকারি দিয়ে কি করবেন জানতে চাইলে তিনি ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, এই এক তরকারি আর ভাত রান্না করেই তার সারা দিনের খাবার হয়ে যাবে। মেয়েটির মুখের কথা কেড়ে নেন বরিশাল থেকে আসা গার্মেন্টে কর্মরত খাদিজা আক্তার। তিনি বলেন, আমরা এক তরকারি রানতেই সময় মতো চুলায় যেতে পারি না, বেশি রাঁধতে গেলে খাওন ছাড়াই থাকা লাগবে। ৮ জন মেয়ে প্রত্যেকেই আলাদা রান্না করে খান। রাজশাহীর জাহানারা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, কেউ এ্যডা খ্যাবে, কেউ ওডা খ্যাবে; কারও সঙ্গে কারও রুচি মিলে না। এ সময় কক্ষের একপাশে বসে পড়ালেখা করছিলেন একজন। একপর্যায়ে বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, আপনারা আস্তে কথা বলেন আমার পরীক্ষা। তিনি এই কথা শেষ করতে না করতেই তার পাশে বসে ফোনে আলাপরত মুক্তা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলে ওঠেন পরীক্ষা তো তোমার আমাদের তো না। বেশি সমস্যা হলে বাইরে গিয়ে পড়ো। উত্তর নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায় কিছুটা ভিন্ন চিত্র। সেখানকার কক্ষগুলো বেশ পরিষ্কার। কক্ষের চার কোনায় চারটি বেড। পরিপাটি বিছানা। ৪ জন মেয়ে থাকে সেখানে। দেয়ালজুড়ে মানচিত্র, গণিতের সূত্র। দরজায় আঠা দিয়ে লাগানো বড় বড় করে লেখা কতিপয় নিয়মকানুন। যেমন কক্ষের ভেতরে ফোনে জোরে কথা বলা যাবে না। রাত ১২টার পরে রুমের লাইট বন্ধ করে দিতে হবে। রাত ৮টার পর বাসার বাইরে থাকা যাবে না। সবসময় রুমের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। গেস্ট নিয়ে এসে রুমের ভেতরে আড্ডা দেয়া যাবে না ইত্যাদি। এতো নিয়মকানুন কেন জানতে চাইলে ইফরিত জেবিন নামে একজন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, এর আগে যারা ছিলেন রুমে তারা রাত ৩টার সময় ও জোরে গান বাজিয়ে নাচগান করতেন। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন তারা। এজন্য বাড়িওয়ালাই এতো নিয়ম করে দিয়েছেন। এখানকার মেস বাসিন্দারা জানান, তাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট রান্নাবান্নায়। কারণ বাড়িটিতে ৩টি কক্ষে ১০ জন মেয়ের বসবাস। তাদের সবার জন্য বরাদ্দ একটি মাত্র চুলা। এ ব্যাপারে কুমিল্লার মেয়ে সুমনা রহমান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, মাঝে মাঝে খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে যাই, তখন খুব মায়ের কথা মনে পড়ে। মা একবেলাও খাবার না খেয়ে থাকতে দিতেন না আর মেসে খাওয়ার কোন ঠিক নেই। দক্ষিণ নীলক্ষেত আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভয়াবহ পরিস্থিতি। একটি বড় কক্ষে থাকেন ৮ জন মেয়ে। তার মধ্যে আবার ৫ জন অতিরিক্ত। ৮ জনের কক্ষে ১৩ জন কেন জানতে চাইলে গার্মেন্ট শ্রমিক লায়লা রেগে যান। বলেন, একজন পারলে ১০ জন গেস্ট নিয়ে থাকে। বান্ধবীর তো আর কারও অভাব নেই। লায়লার কথা কেড়ে নিয়ে প্রাইভেট কোম্পানিতে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কর্মরত শ্রাবণী বলেন, ঢাকায় এসে সবাই তো অসহায় হয়ে যায়। আর তাই অল্প পরিচিত হলেও মেয়েরা একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এখানে আসে। জুঁই নামে একজন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে জানান, যে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময় চাপটা বেড়ে যায়। দুরের আত্মীয়, কাছের আত্মীয়, প্রতিবেশীরা আসেন। এসব অতিথিদের সাধ্যমতো আপ্যায়নও করেন মেসের বাসিন্দা মেয়েরা। রান্নাঘরে গিয়ে দেখা যায়, পাশেই হার্ডবোর্ড দিয়ে ছোট্ট একটি কক্ষ বানানো। সেখানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড গরম গা পুড়ে যাওয়ার দশা হয়। সেখানেই বিছানায় বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে লুডু খেলতে দেখা যায় তিনটি মেয়েকে। তাদের একজন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, মেসজীবন আনন্দ-বেদনার এক মিশ্রণ।
উল্টো চিত্র: ঠিক এগুলোরই উল্টো চিত্র দেখা যায় লালবাগ এলাকার একটি মেসে। সেখানে ৩ রুম ও ডাইনিং সম্বলিত একটি ফ্ল্যাট বাসায় ৬ জন মেয়ে থাকেন। অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সাজানো-গোছানো বাড়িটিতে নোংরার লেশমাত্র কোথাও নেই। এমনকি এটি যে একটি মেস সেটাও বোঝার উপায় নেই। সেখানে গিয়ে ৬ জনের সবাইকে পাওয়া যায় না পাওয়া যায় মাত্র ২ জনকে। কাজের বুয়া দরজা খুলে দেয়ার পর ভেতরে গিয়ে দেখা যায় ২ জন ২ রুমে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছেন। প্রতিবেদককে দেখামাত্রই হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন তারা। কথা বলে জানা যায়, যারা সেখানে থাকেন তাদের সকলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও মেডিক্যালের সদ্য পাস করা ছাত্রী। এদের সকলেই মোটামুটি চাকরিজীবী। দুজন এতো মনোযোগ দিয়ে কি পড়ছেন জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রী সামিরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বললেন, ৩৫তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর ঢাকা মেডিক্যালের সাবেক ছাত্রী অপর্ণা জানালেন এফসিপিএস পরীক্ষা তাই জোরালো প্রস্তুতি চলছে। এই মেসে রান্না খাওয়ার বিষয়টি পুরোটাই কাজের বুয়ার ওপর। তিনি তার ইচ্ছেমতো বাজার করে, রান্না করে। বাড়িঘর পরিষ্কার করে দিয়ে চলে যান। কেমন লাগে এই জীবন জানতে চাইলে সামিরা বলেন মা-বাবা পরিবার থেকে দূরে থাকা অনেক কষ্টের। তারপরও রুমমেটদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে ভালই লাগে। যান্ত্রিকতার এই যুগে মানুষ ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। দূরে সরে যাচ্ছে একজনের কাছ থেকে আরেকজন। মানুষ সমাজিক জীব এই কথাটাই যেন মিথ্যা প্রতিপন্ন হতে বসেছে। সেখানে কিছুটা হলেও আন্তরিকতার সুযোগ এনে দেয় ঢাকা শহরের মেসগুলো। এখানে একজনের বিপদে অন্যরা সাথী হন। একজনের সুখে অন্যরা হাসে আবার দুঃখে কাঁদে। মেস জীবন দিয়ে শুরু হলেও অনেকে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন অনেক উঁচুতে। বদলাচ্ছে অবস্থান। কিন্তু মেস জীবনের হৃদ্যতা আর যন্ত্রণা দুটির স্মৃতিই কেউ ভুলতে পারে না।

অর্ণব ভট্টএক্সক্লুসিভ
ছোট্ট একটি অগোছালো কক্ষ। ভেতরে আবছায়া অন্ধকার ও ভ্যাপসা গন্ধ। চারদিকে ঝুলছে পোশাক। ইঁদুর ও তেলাপোকার অবাধ বিচরণ। দিনের বেলায় জ্বালিয়ে রাখতে হয় আলো। এরই মাঝে কেউ পড়ছে বই, কেউ গল্প করছে ফোনে। অন্যদিকে কেউ রান্নার আয়োজন করছে, কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউবা তৈরি হচ্ছে বাইরে যেতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই পলাশী...