Oporadher Dairy Theke
বেচাকেনার সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন দাপুটে লোক জড়িত থাকায় বন্ধ হচ্ছে না ভয়াবহ ইয়াবা ব্যবসা। একসময় টেকনাফ ইয়াবার মূল ঘাঁটি হলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলো এখন ইয়াবার মূল বাজার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে মরণনেশা ইয়াবা অবাধে বিক্রি হচ্ছে গ্রামগঞ্জে। যারা নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তারাই এখন ইয়াবা সেবন ও ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। নীরব ঘাতক ইয়াবার সর্বনাশা থাবায় লাখো পরিবারের সন্তানদের জীবন এখন বিপন্ন। এমন সন্তানদের মায়ের কান্না ঘরে ঘরে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধ্বংস করে ইয়াবা ব্যবসার এ সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেছেন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, তরুণ-তরুণী শুধু নয়; ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ এখন ইয়াবায় আসক্ত। সহজলভ্যতার কারণেই ইয়াবা আসক্তির সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসাবেই দেশে ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ২৫ লাখ। তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলছেন, মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর নেশাদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা অন্যতম। ইয়াবাকে ক্রেজি মেডিসিন বা পাগলা ওষুধ বলা হয়। মেথ্যাম ফিটামিন, উত্তেজক পদার্থ ক্যাফিনের সঙ্গে হেরোইন মিশিয়ে তৈরি করা হয় ইয়াবা। এ নেশাদ্রব্য হেরোইনের চেয়ে ভয়াবহ। ইয়াবা সেবনের পর সাধারণত অনিদ্রা, চাঞ্চল্য ও শরীরে উত্তেজনা দেখা দেয়। ক্রমান্বয়ে আসক্ত হওয়ার পর এটা মানবশরীরে নানা প্রকার ক্ষতি করে থাকে। হতাশা, বিষাদ, ভয়, সন্দেহ, অনিশ্চয়তার উদ্ভব ঘটে। এ ছাড়া এটি আচরণগতভাবে সহিংস করে তোলে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলছেন, ইয়াবার প্রভাবেই অপরাধীরা ক্রমে সহিংস হয়ে উঠছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, শহর থেকে অজপাড়াগাঁ পর্যন্ত সব স্থানেই এখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ‘ক্রেজি ড্রাগ’ ইয়াবা। মোবাইলে অর্ডার দিলেই হোম সার্ভিসে মুহূর্তেই হাতে চলে আসছে ভয়ঙ্কর মাদক ইয়াবা। এ ছাড়া এখন পাওয়া যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু টং ও মুদি থেকে শুরু করে বড় দোকানগুলোতেও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতায় চলছে এ মাদক ব্যবসা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, মাদক পাচার বন্ধে ভারতের সঙ্গে চুক্তির পর ফেনসিডিল পাচার কমে গেছে। ভারত সরকার বাংলাদেশের সীমান্তে অবৈধ ফেনসিডিল কারখানাগুলো উচ্ছেদ করেছে। এখন কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইয়াবা পাচার কমে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আশির দশকের শুরুতে ‘ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি’ নামের একটি সংগঠন মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় কারখানা স্থাপন করে ইয়াবা তৈরি শুরু করে। ওই সময় বাংলাদেশে ইয়াবার তেমন পরিচিতি ছিল না। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে মাদকদ্রব্যটি বাংলাদেশের একশ্রেণির উচ্চাভিলাষী সেবনকারীর প্রিয় হয়ে ওঠে; যার সূত্র ধরে টেকনাফের হাজী বশরের ছেলে বহুল আলোচিত একটেল রমজান ও বার্মাইয়া শুক্কুর নামের দুজন হুন্ডি ব্যবসায়ী ২০০০ সালের গোড়ায় বাংলাদেশে ইয়াবা আনা শুরু করেন। তাদের হাত ধরে সম্প্রসারিত হয় বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার। ইয়াবার ব্যাপক চাহিদার কথা বিবেচনা করে সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের মংডু শহর ও তার আশপাশে সাতটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে ইয়াবা। মিয়ানমার সীমান্ত গলিয়ে চোরাপথে এসব ইয়াবা আসছে টেকনাফে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের মংডু শহরের এসব কারখানার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারখানায় পাঁচ প্রকার ইয়াবা তৈরি হয়। এগুলো এসওয়াই, জিপি, এনওয়াই, ডব্লিউওয়াই ও গোল্ডেন নামে পরিচিত। প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ পিসের বেশি ইয়াবা আসছে বাংলাদেশে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ১০৩ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯০ জন দেশি ও ১৩ জন মিয়ানমারের অধিবাসী। তবে অন্য সূত্রগুলো জানায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ ও র‌্যাবের তৎপরতার বাইরে বড় মাপের আরও দুই শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী সক্রিয় রয়েছেন। টেকনাফের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের এমপিসহ তার তিন ভাইয়ের নাম রয়েছে। তিনজনই শীর্ষ ব্যবসায়ী হিসেবে তালিকাভুক্ত। এ পরিবারের সদস্যদের মতোই আরও অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ী তালিকাভুক্ত হয়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে। দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর তথ্যমতে, ৯০ শতাংশ ইয়াবা ব্যবসায়ী গ্রেফতার এড়িয়ে চলছেন। ১০ শতাংশ গ্রেফতার হলেও তাদের অনেকেই জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার একই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ইয়াবার মূল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী কয়েক ব্যক্তি। রাজধানীর বনানী, গুলশান ও বারিধারায় রয়েছে তাদেরই চক্র। এ চক্রের সদস্য রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা। ইয়াবা ব্যবসায় তারা মুনাফা করছেন কোটি কোটি টাকা।সূত্রমতে, ইয়াবার মূল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে। মিয়ানমার থেকে নাফ নদ পার হয়ে চালান আসে টেকনাফে। সেখান থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে ইয়াবার চালান পাঠানো হয় কক্সবাজারে। এর বাইরে কক্সবাজারের উখিয়ার ঘুনধুম সীমান্ত দিয়েও ঢুকছে ইয়াবা। কক্সবাজার থেকে সারা দেশে ইয়াবা ছড়াচ্ছে এখানকার নয়টি সিন্ডিকেট। এদের রয়েছে সাব-গ্রুপ। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার একশ্রেণির মধ্য ও নিু বিত্ত বেকার যুবকের ৮ বা ১০ জনের দল বাসে বা ট্রেনে ঢাকায় আসে। তারাই মূলত এর বাহক। ছোট আকারের এ ট্যাবলেট বহনের কায়দাও অভিনব। শার্টের কলার, মুঠোফোনের ভিতর, প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে পায়ুপথে ঢুকিয়ে আনার রেকর্ডও রয়েছে। ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে টঙ্গী স্টেশনে নেমে যান তারা। ওখান থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে জোনভিত্তিক নেতার কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হয়। তারাই ছড়িয়ে দিচ্ছেন রাজধানীসহ সারা দেশে। ইয়াবার বৃত্তভিত্তিক নেটওয়ার্ক শুরু হয় নগরীর গুলশান-বারিধারা থেকে। পরে বনানী, নিকেতন ও উত্তরায় তা ছড়িয়ে পড়ে। এসব নেটওয়ার্কে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা জড়িয়ে পড়েছে। অভিজাত এলাকাগুলোর ক্লাব, রেস্তোরাঁ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল-কলেজ টার্গেট করে বিস্তারকারীরা। সূত্র জানায়, দেশের ভিতরও তৈরি হচ্ছে ইয়াবা। থাইল্যান্ড থেকে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও কারিগর এনে গোপনে তৈরি করা হচ্ছে এগুলো। র‌্যাবের অভিযানে এ রকম বেশ কয়েকটি কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে।

সুরুজ বাঙালীঅপরাধের ডায়েরী থেকে
বেচাকেনার সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিভিন্ন দাপুটে লোক জড়িত থাকায় বন্ধ হচ্ছে না ভয়াবহ ইয়াবা ব্যবসা। একসময় টেকনাফ ইয়াবার মূল ঘাঁটি হলেও এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলো এখন ইয়াবার মূল বাজার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে মরণনেশা ইয়াবা অবাধে বিক্রি হচ্ছে...