94038_ISLAM
ইসলামোফোবিয়ার অর্থ হলো ইসলাম নিয়ে অহেতুক ভীতি বা ঘৃণা। এ টার্মটির সঙ্গে এখন সবাই কমবেশী পরিচিত। মার্কিন লেখক ন্যাথান লিন বলছেন, এ পরিস্থিতি এমনিতেই সৃষ্টি হয় নি। বরং, পরিকল্পিতভাবে এ ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ভয় বিক্রি হয় সহজেই। আর ডানপন্থি পক্ষপাতমূলক বুদ্ধিজীবী, ব্লগার, রাজনীতিবিদ, প-িত এবং ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে যে ‘ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি’ রয়েছে তারা সেটা খুব ভালভাবেই জানেন। বছরের পর বছর ধরে তারা পর্দার আড়ালে নিজ নিজ দেশবাসীদের বোঝাতে পরিশ্রম করেছেন যে মুসলিমরা শত্রু। বিরাট সাফল্য আর যশ-খ্যাতির জন্য ৯/১১ এর ভূত/প্রেতাত্মা খুঁড়ে এনে ভীতসন্ত্রস্ত জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করেছেন। তাদের সে পরিকল্পনা সফল হয়েছে। ইসলামোফোবিয়ার যে জোয়ার ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তা স্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়। এটা তাদের পরিকল্পিত। ন্যাথান লিনের লেখা ‘ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি- হাও দ্য রাইটস ম্যানুফ্যাকচার্স ফিয়ার অব মুসলিম’ বইটির উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব। অনুবাদ করেছেন হাসনাইন মেহেদী। ]
বাংলাদেশী আহমেদ শরীফ (৪৪)। নিউ ইয়র্কের ট্যাক্সিচালক। ম্যানহাটনের অলিগলি মুখস্থ তার। অবশ্য এটা তার কাজ। রাস্তাঘাট পরিচিত থাকা; সঠিক গন্তব্যে আরোহীদের পৌঁছে দেয়া। তা ছাড়া ১৫ বছর ধরে শহরটিতে ট্যাক্সি চালিয়ে আসছেন তিনি। অপেশাদার যে কোন গাড়ি চালকের তুলনায় শহরের ছোট বড় সব রাস্তা তার নখদর্পণে। এ পেশায় থাকার বদৌলতে হাজারো মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ক্ষণিকের জন্য হলেও আলাপচারিতা জমে ওঠে। প্রাসঙ্গিক, অপ্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে গল্প করেন আরোহীরা। ৪ সন্তানের জনক শরীফ পরিবারসহ থাকেন জ্যামাইকার কুইন্সে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সুখেই কাটছিল জীবন। দিনটা ছিল ২০১০ সালের ২৪শে আগস্ট। রোজার মাস চলছিল। শরীফ রোজা ছিলেন বরাবরের মতো। আর দশটা দিনের মতো এদিনও শুরু হয়েছিল চিরাচরিত রুটিনে। কিন্তু শরীফ তখনও জানতো না তার সঙ্গে যা ঘটতে চলেছে, তা পাল্টে দেবে তার পুরো জীবন। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ৬টা ছুঁই ছুঁই। ইফতারের দু’ঘণ্টা বাকি। বিকাল বেলার শিফটে বের হলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রথম আরোহীর দেখা পেলেন শরীফ। ঘড়ির সোনালী চুলের সুদর্শন এক যুবক হাত উঁচিয়ে ট্যাক্সি থামাতে ইশারা করলো। শরীফ ট্যাক্সি থামালেন। পেছনের আসনে উঠে বসলো ওই যুবক। নাম মাইকেল এনরাইট। তার গন্তব্য ছিল ফর্টি টু এন্ড সেকেন্ড এভিন্যিউ।
গাড়িতে উঠেই এনরাইট শরীফকে সম্বোধন জানালো- ‘সালাম আলেকুম’। শরীফ এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু খুঁজে পেলেন না। তবে বিষয়টা কিছুটা বিস্ময়ের উদ্রেক করার ছিল বৈকি। ২১ বছরের শ্বেতাঙ্গ এক যুবক আলাপচারিতা শুরু করার জন্য মুসলিমদের সালাম দেয়ার ভাষা বেছে নেয়াটা তেমন একটা পরিচিত ঘটনা নয়। শরীফের মনে শুধু উদ্রেক হলো- বাদামি রংয়ের চামড়ার অধিকারী বিশেষ করে যেসব পুরুষদের দাড়ি আছে তাদেরকে অনেকে আরব বলে ধরে নেয়। এটা সচরাচর হয়ে থাকে। শরীফ আরব ছিলেন না বলাই বাহুল্য। তার মাতৃভাষা বাংলা। আর ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ছিল চলনসই। আরবিতে সালাম দেয়ার পর এনরাইট শরীফকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘আপনার রোজা কেমন চলছে? শরীফ উত্তর দিলেন ‘ভালো’। এবারে শরীফ বুঝতে পারলেন, সালাম দেয়ার অর্থ ছিল, তিনি যে মুসলিম সেটা বুঝতে পেরেই গাড়ির আরোহী সালাম দিয়েছিল। এনরাইটের কাছে রোজার রীতিটা ছিল হাস্যকর। এমনটি উদ্ভট। আর রোজা নিয়ে তার এমন অভিমত সে শরীফকে বলতে লাগলো খোলাখুলি। আলাপচারিতার প্রথম দিকে যতটুকু সৌজন্য ছিল এতক্ষণে তা ফিকে হয়ে গিয়েছিল। একতরফা বক্তব্যে রূপ নেয় কথোপকথন। শরীফ নীরব থাকাটাই শ্রেয় মনে করলেন। তার গাড়িতে অল্পবয়সী এক আরোহী মৌখিকভাবে ইসলামের কটূক্তি করে চলেছেন তাতে বিরক্ত হলেও শরীফ উপলব্ধি করেন বাদানুবাদে জড়িয়ে না পড়াটাই ছিল উত্তম। আর তাছাড়া সেসময় প্রস্তাবিত একটি ইসলামিক কালচারাল সেন্টার নিয়ে পুরো শহরের মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল চরমে। মুসলিম বিরোধী মনোভাবের কোন কমতি ছিল না। বরং এটা ছিল বেশ সাধারণ একটা বিষয়। কাজেই শরীফ কথা বলা বন্ধ রাখেন। একপর্যায়ে এনরাইটও চুপ হয়ে যায়। এনরাইটের গন্তব্যে পৌঁছুতে যখন আর তিন ব্লক বাকি তখন আবারও নীরবতায় ছেদ পড়লো। হঠাৎ করে এনরাইট চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘এটাকেই চেকপয়েন্ট মনে কর, এখানেই যাত্রাশেষ, (অকথ্য গালি) আর তোকে আমাকে থামাতে হবে’। হতচকিত হয়ে শরীফ গাড়ি থামিয়ে দেয়। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই এনরাইট পকেটে হাত দিয়ে ভাঁজ করা ছুরি বের করে মুহূর্তের মধ্যে পেছন থেকে শরীফের গলায় ছুরিটা ধরে টান দেয়। ফিনকি দিয়ে গলা দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। আতঙ্কে বিহ্বল শরীফ এনরাইটের দিকে ঘুরে তাকায়। এবারে মুখের ওপর এলোপাতাড়ি টান দেয় ধারালো ছুরি দিয়ে। কেটে যায় হাত আর আঙুলও। শরীফ কাঁদতে কাঁদতে প্রাণান্ত আবেদন জানায়, ‘তোমার পায়ে পড়ি, আমাকে মেরো না। আমি অনেক পরিশ্রম করি। আমার একটা পরিবার আছে।’ ক্যাবটা তখনও ধীরে ধীরে চলছিল। সে অবস্থাতেই পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এনরাইট। পরে অবশ্য আটক হয় সে। তার সঙ্গে পাওয়া যায় খালি এক বোতল হুইস্কি। পুলিশ সদস্যদের দেখেই সে চিৎকার করে মিথ্যা অভিযোগ করতে থাকে, ‘ওই লোকটা আমাকে ছিনতাই করতে চেয়েছিল। আমি আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছি শুধু। আমি ভুল কি করেছি?’ এনরাইট বলতে থাকে, ‘আমি আফগানিস্তান থেকে ফিরেছি কিছুদিন হলো। আমি আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাই’। পুলিশ তার হাতকড়া পরানোর পরও ক্ষোভে ফুসতে ফুসতে এলোমেলো কথা বলতে থাকে সে। পুলিশদেরকে সম্বোধন করে, ‘সালাম আলেকুম’। পুলিশদের দোষারোপ করতে থাকে। দেশে ভবন উড়িতে দিতে মুসলিমদের সুযোগ দেয়ার জন্য পুলিশ দায়ী বলে মন্তব্য করে। আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে টাস্কফোর্স লেদারনেক ব্যাটালিয়নের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিল এনরাইট। তবে আফগানিস্তানে পার করা সময়ের সঙ্গে সেদিন সন্ধ্যার কোন যোগসূত্র ছিল না। তারপরও তার দৃষ্টিতে শরীফের ওপর প্রাণঘাতী হামলা করাটাই ছিল তার মিশন।
সৌভাগ্যবশত, ওই হামলা থেকে পরে সেরে উঠেন শরীফ। কিন্তু ওই ঘটনা গভীর ক্ষত রেখে যায় তার মনে। আবারও এমন হামলার শিকার হতে পারেন এমন আশঙ্কা মনে দানা বেঁধে ওঠে তার। পরে ম্যানহাটন থেকে বাফেলোতে পরিবারসহ স্থানান্তর হন তিনি। এনরাইটের ওই অপরাধকর্মকে পরে ঘৃণাপ্রসূত অপরাধ (হেট ক্রাইম) বলে আখ্যা দেয়া হয়। কিছু রিপোর্টে বলা হয় মদের প্রভাবে এমন কা- ঘটিয়েছিলেন এনরাইট। বেশ কিছুদিন মদ্যপানের অভ্যাসের সঙ্গে লড়ছিলেন তিনি। পরে তদন্তকারীদের এনরাইট বলেছিলেন, তার কাছে উদ্ধার হওয়া জনি ওয়াকারের খালি বোতলটা একা একা শেষ হয় নি। অর্থাৎ তিনি পুরোটা নিজেই খেয়েছিলেন। তার নেশার মাত্রা যতটুকুই ছিল না কেন, মাতলামি সৃষ্টিকারী একমাত্র উপাদান হুইস্কি ছিল না। খালি বোতলের পাশাপাশি পুলিশ তার একটি ব্যক্তিগত ছোট ডায়েরি খুঁজে পায়। এর পাতায় পাতায় মুসলিমবিরোধী কঠিন সব মনোভাব লেখা ছিল। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, এনরাইট তার ওই জার্নালে মুসলিমদের হত্যাকারীদের সমতুল্য বলে আখ্যা দিয়েছে। বলেছে, মুসলিমদের যে সাহায্য করা হচ্ছে তার জন্য তারা অকৃতজ্ঞ; বিবেকবর্জিত নিকৃষ্ট হত্যাকারীর দল।

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2015/09/94038_ISLAM.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2015/09/94038_ISLAM-300x225.jpgহাসন রাজাএক্সক্লুসিভ
ইসলামোফোবিয়ার অর্থ হলো ইসলাম নিয়ে অহেতুক ভীতি বা ঘৃণা। এ টার্মটির সঙ্গে এখন সবাই কমবেশী পরিচিত। মার্কিন লেখক ন্যাথান লিন বলছেন, এ পরিস্থিতি এমনিতেই সৃষ্টি হয় নি। বরং, পরিকল্পিতভাবে এ ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ভয় বিক্রি হয় সহজেই। আর ডানপন্থি পক্ষপাতমূলক বুদ্ধিজীবী, ব্লগার, রাজনীতিবিদ, প-িত এবং ধর্মীয়...