বিশেষ প্রতিবেদক ।
রহিম উদ্দিন। দুই সন্তানের জনক। পেশায় রিকশা চালক। মাসের গড় আয় ৯ হাজার টাকা। স্ত্রী অন্যের বাসায় কাজ করেন। তাদের দু সন্তানের মধ্যে ছেলেকে একটি স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ান।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।
দুই বেলা কোচিংসহ এই সন্তানের পেছনে মাসিক ব্যয় ৩ হাজার টাকা। অন্য সন্তানের পেছনে ব্যয় মাসিক ১ হাজার টাকা। অর্থ সংকটের কারণে ছোট সন্তানকে ভালোভাবে পড়ানোর সুযোগও হয় না তার।

আজিজুল ইসলাম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। মাসিক বেতন ৪২ হাজার টাকা। রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলে তার সন্তান সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলের মাসিক টিউশন ফি ১২শ টাকা। প্রাইভেট কোচিং পড়তে খরচ প্রায় ৪ হাজার। স্কুলে আসা যাওয়ার পেছনে ব্যয় ৬ হাজার। টিফিন ও অন্যান্য খাত মিলে এক সন্তানের পেছনে প্রতিমাসে তার ১৪ হাজার । এছাড়া নোট গাইড কিনতে বছরের শুরুতে গুনতে হয়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। ভর্তি ও সেশন চার্জ বাবদ বছরের শুরুতে গুনতে হয়েছে ১২ হাজার টাকা। তিনবার পরীক্ষার ফি’র পেছনে খরচ হয়েছে ২৪শ টাকা। বছরে দুবার ইউনিফরমের পেছনে ব্যয় করতে হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এভাবে বছরের শিক্ষায় নানা প্রকারের ব্যয়ে দিশেহারা এই অভিভাবক।

শিক্ষায় সরকারের নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে। রয়েছে নানা অর্জনও। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বছরের শুরুতে বিনামূল্যের বই দেওয়া হয়, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি-মেধাবৃত্তি, শিক্ষার ভালো পরিবেশের জন্য আধুনিক ভবন, শিক্ষা উপকরণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সরকার শিক্ষার্থীদের পাঠদান, মান উন্নয়ন ও প্রশাসনিক তদারকিসহ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২২ হাজার, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগকে ২৩ হাজার, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার পেছনে বছরে ৫ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা ব্যয় করছে। অভিভাবকদের প্রশ্ন, সরকারের এত উদ্যোগ ও এত টাকা ব্যয়ের পরও কেন অভিভাবকদের আয়ের এক তৃতীয়াংশ ব্যয় করতে হবে ?

শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় গলদ থাকার কারণেই অভিভাবকদের এত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা বলছে, বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্তরে ঝরে পড়ে। ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ অভিভাবকদের দারিদ্র্য। শিক্ষা ব্যয় কম হলে ঝরে পড়ার হার অনেক কমতো বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিবছরই কাগজের দাম যেমন বেড়েছে তেমনি টিউশন ফি, কোচিং ফি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ভাড়া-সবই বেড়েছে। কিন্তু অভিভাবকদের আয় তেমন বাড়ছে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করছেন তারা খুব একটা ভালো নেই। বাসা ভাড়াসহ নানা খাতে সংসারের ব্যয় রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

আমেনা আক্তার নামের এক অভিভাবকের মতে, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় রাজধানীর মধ্য আয়ের পরিবারের খরচের অন্যতম প্রধান খাত। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি মোট সংসার খরচের ২০-২৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও শিক্ষার মাধ্যম ও স্তর অনুযায়ী এটি অনেক পরিবারের খাবারের ব্যয়কে ছাড়িয়ে যায়।

আমিরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলছেন, সন্তানরা আজ ভালো ফল করছে। এর পেছনে অভিভাবকদের শ্রম ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সরকারের কি সাফল্য আছে তা মেলানো কষ্টকর। আর ঢাকার ছাত্রছাত্রীদের সাফল্যের জন্য অনেক দাম দিতে হচ্ছে আমাদের।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক। প্রায় সরকারি ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা শহরের চেয়ে অনেক বেশি। শহরের বেশিরভাগ প্রাথমিক শিক্ষা বেসরকারিভাবে পরিচালিত।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ঐক্য পরিষদের এক তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন কিন্ডারগার্টেন রয়েছে ৬৫ হাজার। ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরে কিন্ডারগার্টেন ছাড়াও মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব স্কুলের লেখাপড়ার খরচ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক স্কুলের কয়েকগুণ বেশি। শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এছাড়া সংখ্যায়ও কম। এ কারণে এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আগ্রহ কম অভিভাবকদের। তাই প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও বড় একটি অংশ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত আছে, যাদের মাসে এক তৃতীয়াংশ খরচ হয় শিক্ষায়।

দেশে মাধ্যমিক স্কুল ২৮ হাজারের বেশি । পড়ছে ১ কোটির বেশি শিক্ষার্থী। ৯৮ ভাগ স্কুল বেসরকারিভাবে পরিচালিত। ম্যানেজিং কমিটি পরিচালিত এসব স্কুলগুলোতে পড়তে নানামুখী খরচ করতে হয় সন্তানের জন্য। কোচিংমুখী শিক্ষা এ স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলুষিত করছে। শিক্ষাখাতে যে ব্যয় হয় তার ৩০ থেকে ৬০ ভাগই খরচ হয় কোচিংয়ের পেছনে।

চার হাজারের বেশি কলেজে পড়ছে ৩৮ লাখ শিক্ষার্থী। এছাড়া রয়েছে ৩৮ সরকারি এবং ৯৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে পড়ছে ছয় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে গলদগর্ম হতে হয় অভিভাবকদের। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়তি টিউশন ফি পরিশোধ করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন অভিভাবকরা।

জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য কাজী ফারুক আহমদ ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধের কথা জাতিসংঘও বলেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাবলিক এডুকেশনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারের উচিত শিক্ষার বাস্তব চিত্র জানার জন্য গবেষণা এবং একাধিক বিকল্প মাধ্যম থেকে শিক্ষার তথ্য সংগ্রহ করা। শিক্ষার জন্য অভিভাবকদের এক তৃতীয়াংশ ব্যয়ের কারণে তারা দিশেহারা তো হবেই।
খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের।

http://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2017/11/46.jpghttp://crimereporter24.com/wp-content/uploads/2017/11/46-300x300.jpgশিশির সমরাটএক্সক্লুসিভ
বিশেষ প্রতিবেদক । রহিম উদ্দিন। দুই সন্তানের জনক। পেশায় রিকশা চালক। মাসের গড় আয় ৯ হাজার টাকা। স্ত্রী অন্যের বাসায় কাজ করেন। তাদের দু সন্তানের মধ্যে ছেলেকে একটি স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়ান।খবর ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমের। দুই বেলা কোচিংসহ এই সন্তানের পেছনে মাসিক ব্যয় ৩ হাজার টাকা। অন্য...