1439658808
‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে/ কী জানি পরান কী যে চায়!…/ আজি মধুর বাতাসে হূদয় উদাসে, রহে না আবাসে মন হায়…!’ শরতের আগমনে এভাবেই উতলা হয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঋতু পরিক্রমায় আজ আবারও এসেছে শরত্। আকাশে রৌদ্র-মেঘের লুকোচুরি খেলা জানান দিচ্ছে তার আগমনীবার্তা। আজ প্রকৃতির মালিন্য মুছে দিতে মেঘের সিংহবাহনে সে এলো মধুর মুরতি নিয়ে। আজ ১লা ভাদ্র। মেঘমুক্ত আকাশ, শুভ্র শিউলির মন মাতানো ঘ্রাণ আর দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠে নিরন্তর ঢেউ খেলানো দোলই জানান দিচ্ছে আজ ভাদ্র মাসের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে শরত্ও। বাংলার প্রকৃতি আজ শরতের স্নিগ্ধ পরশে হবে আন্দোলিত।

শরতের প্রভাত সূর্য শিশিরসিক্ত বাতাসে ভর করে নীল আকাশকে রাঙিয়ে লাজুক করে তোলে। গগনে গগনে শুধু অপরূপ রূপের লীলাখেলা। ভুবন জুড়ে এক নতুন দৃশ্যপট রচিত হয়: ‘আজি কি তোমার মধুর মুরতি/হেরিনু শারদ প্রভাতে!/হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ/ঝলিছে অমল শোভাতে…।’ বসন্তের পুষ্পছাওয়া বনতল আর দখিনা সমীরণ আকাশে-বাতাসে শিহরণ জাগানোর পর গ্রীষ্মের অগ্নিবাণে তা জ্বলে-পুড়ে বিবর্ণরূপ ধারণ করলেও বর্ষা তাতে আবার নবীন প্রাণের প্রণোদনা বয়ে আনে। এরপর ঋতু বৈচিত্র্যের এ বঙ্গভাগে যেন প্রকৃতিতে কাঁপন তুলে আসে শরত্। এক আশ্চর্য রূপমাধুরী নিয়ে ফেরে সে দ্বারে দ্বারে। সে যেন এক নিপুণ কারিগর। স্বর্ণরেণু দিয়ে গড়ে দেয় প্রকৃতি। তার পরশে প্রকৃতি হয়ে ওঠে ঢলঢল লাবণ্যময়। ধরণী হয়ে ওঠে শ্যামল সুধাময়। কবিগুরুর ভাষায়:‘তুলি মেঘভার আকাশ তোমার করেছ সুনীল বরণী/শিশির ছিটায়ে করেছ শীতল/ তোমার শ্যামল ধরণী।’সোনা ঝরানো এই ঋতু অবিরল আনন্দের ফল্গুধারা বইয়ে দেয় হূদয়ে-মনে। প্রাণে প্রাণে বাজে মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবির বিরহকণ্ঠ:‘ই ভরা বাদর মাহ ভাদর/শূন্য মন্দির মোর…..।’ শরত্ মানেই যেন জুঁই-শেফালি-শিউলি-বেলির ম’ ম’ সুবাসে ভরে ওঠা মন। বনতল, গৃহআঙিনায় কেবল গন্ধে মাতাল ফুলের বাহার। আর আকাশে শুভ্র মেঘের ভেলা। জলহারা মেঘমালা পেঁজা তুলোর মতো নীল নভোতলে ভেসে বেড়ায় পথহারা উদাসী পথিকের মতো। শরতের প্রকৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা-/ নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই– লুকোচুরি খেলা…।’

শরত্কালে কখনো কখনো বর্ষণ হয়, তবে বর্ষার মতো অবিরাম নয়। বরং শরতের বৃষ্টি মনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। চারপাশের শুভ্রতার মাঝে বৃষ্টির ফোঁটা যেন আনন্দ-বারি! বৃষ্টি শেষে আবারও রোদ। দিগন্তজুড়ে একে সাতরঙা হাসি দিয়ে ফুটে ওঠে রংধনু। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ শরতের চরিত্রের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন প্রিয়তমাকে। প্রেম-দ্রোহের কবি নজরুলকেও আলোড়িত করেছিল শরতের প্রকৃতি। বিশেষ করে শরতের শিউলি তাকে মুগ্ধ করেছিল। ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে।/ এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে…।’

রবীন্দ্রনাথ শরেক স্বল্পায়ু বলেছেন। শরেক চেনা যায় প্রকৃতির মাঝে তার স্বল্প আয়োজনের জন্য। শরতের সম্ভার ওই শিশিরাশ্রু শেফালিকা, কাশমেঘ; আর আগমনী উত্সবে তার সমাপ্তি। শরত্ হচ্ছে আকাশ ও মাটির মিলন। একদিকে নীলাকাশ, আরেকদিকে কচি ফসলের দুরন্তপনা; একদিকে সোনা রোদ, আরেকদিকে সবুজের কচি মুখ; সঙ্গে আকাশ ও মৃত্তিকার যে হূদয়াবেগ, তা আমাদের হূদয়কে নাড়া দিয়ে যায়। ভাদ্র মনকে উদ্বেলিত করে। প্রকৃতির সবুজ ছড়িয়ে পড়ে মাঠে-ঘাটে। এই স্নিগ্ধরূপ তারুণ্যকে উচ্ছ্বসিত আনন্দে ভাসতে উদ্বেল করে তোলে। প্রকৃতি তার ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিতে চায় সকল মনকে। শরত্ সেই ভালোবাসার মনে দোলা দিয়ে যায়। তাই বুঝি মহাকবি কালিদাস শরতের বন্দনা করেছেন: ‘প্রিয়তম আমার! ঐ চেয়ে দেখো, নববধূর ন্যায় সুসজ্জিত শরত্কাল সমাগত।’

ঋতু পরিক্রমায় শ্রাবণ বিদায় নিলো। বর্ষায় খেয়ালি প্রকৃতি প্রসন্ন ছিল না। প্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত হয়নি। তাই বলে দিন তো আর বসে থাকে না। ঋতুচক্র নানা বর্ণে-গন্ধের সমারোহে নিত্য আবর্তিত হয়ে চলে। কিন্তু ‘ইটের প’রে ইট, তার মাঝে মানুষ কীট’— এই শহরের বাসিন্দাদের অন্তর আজ আর শরতের নিমন্ত্রণ অনুভব করে না। প্রতিবারই শরত্ আসে। সাজে অপরূপ সাজে। কিন্তু শহুরে যান্ত্রিক জীবনে এর রূপ দেখার সময় কই?

শুভ সমরাটজাতীয়
‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে/ কী জানি পরান কী যে চায়!.../ আজি মধুর বাতাসে হূদয় উদাসে, রহে না আবাসে মন হায়...!’ শরতের আগমনে এভাবেই উতলা হয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঋতু পরিক্রমায় আজ আবারও এসেছে শরত্। আকাশে রৌদ্র-মেঘের লুকোচুরি খেলা জানান দিচ্ছে তার আগমনীবার্তা। আজ প্রকৃতির মালিন্য মুছে দিতে মেঘের...