08_265668
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান বলেছেন, দুদককে দুর্নীতির তদন্ত করতে না দিলে জনগণের আদালতে যে বিচার হবে তা হবে কঠোর। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি থেকে বাঁচতে আপনি রাতদিন ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করছেন। রথী-মহারথীদের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। কিন্তু এবার আপনি পার পাবেন না। কারণ শেখ হাসিনার সরকারের আমলে কোনো দুর্নীতি বা দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না, হবেও না।’

গতকাল রবিবার বিকেলে শহরের ঐতিহাসিক ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় ‘সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিবিরোধী নাগরিক সমাবেশ’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শামীম ওসমান। আইভীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনি বিভিন্ন স্থানে দৌড়াচ্ছেন, দুদক যাতে দুর্নীতির তদন্ত না করে। আমি বলি দুর্নীতির তদন্ত করতে দেন। নইলে জনগণের আদালতে যে বিচার হবে তা হবে কঠোর।’

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, যিনি ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইভীর পক্ষে ছিলেন। সমাবেশে সিটি মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন করপোরেশনের ২৬ জন কাউন্সিলর। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা জনগণের কাছে দুর্নীতির বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সেই সঙ্গে মেয়র আইভীর দুর্নীতির বিচার দাবি করেন।

শামীম ওসমান বলেন, ‘আজকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমাবেশ হবে, এটার কোনো প্রচারণা হয়নি। কোনো অনলাইন, পত্রিকা বা টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। কিন্তু ডানে-বামে খবর গেছে। আর সেই খবরেই আজ নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ এ সমাবেশে এসেছে। আজকের সমাবেশ গণসমাবেশে পরিণত হয়েছে। আমি অবাক হয়ে যাই, আমার মাথা নত হয়ে যায় মানুষের এ উপস্থিতি দেখে। এর আগে নারায়ণগঞ্জের মানুষ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আজও মানুষ জেগে উঠেছে।’

এদিকে সমাবেশ ঘিরে ডিআইটি এলাকায় জনস্রোত নামে। দুপুরের পর থেকে সিটির বিভিন্ন এলাকা থেকে মেয়র আইভীর দুর্নীতির চিত্রসংবলিত ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয় বিক্ষুব্ধ জনতা। প্রতিবাদকারীরা আইভীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে রাজপথ মুখর করে তোলে। সমাবেশে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ উপস্থিত ছিল।

সিটি করপোরেশনের টেন্ডারের আগের দিন রাতেই কাজ ভাগ হয়ে যায়- এ কথা উল্লেখ করে শামীম ওসমান বলেন, ‘ঘুরেফিরে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই এসব কাজ পাচ্ছে। মুনিয়া, রত্না, জাকির আর সুফিয়ানরা এসব কাজ ভাগ করে নেয়। একসময়ে আমার ছেলে সারোয়ার ও মাকসুদের চা আনা-নেওয়া করত সুফিয়ান। সে এখন নারায়ণগঞ্জের সর্বোচ্চ ট্যাক্স পেয়ার।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজের ব্যানারে নেতাকর্মীরা সমাবেশ করে বলেছে, আমি যেন আর আইভীকে বোন বলে না ডাকি, তাঁকে যেন সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি না করি। কিন্তু তবু আমি চেয়েছিলাম। তবে আজকে হাজার হাজার মানুষ যেভাবে হাত তুলে আমাকে আইভীকে বোন না ডাকতে, রাজনীতি না করতে বলেছে, তাই আমি ইচ্ছে থাকার পরেও অনেক কিছু করতে পারব না। কারণ আমি তো জনগণের গোলাম।’

শামীম ওসমান বলেন, ‘কয়েকজন সৎ সাংবাদিকের কাছ থেকেই আমি সিটি করপোরেশনের দুর্নীতির তথ্যগুলো পেয়েছি।’ মেয়র আইভীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সমাবেশে এখন প্রায় ২৬ জন কাউন্সিলর উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছেন। মেয়রের লজ্জা হওয়া দরকার। তাঁর বিরুদ্ধে এটা অনাস্থা হয়ে গেছে বলা যায়। লজ্জা থাকলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত। দুর্নীতির সকল প্রমাণ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পেয়েছে। এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।’

বিভিন্ন হত্যা প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, ‘যুবলীগ নেতা পারভেজকে হত্যা করা হয়েছে। সেখানে মেয়রের ভাই ছিল, বিতর্কিত ঠিকাদার ও আইভীর সঙ্গী সুফিয়ান ছিল।’

নিজের বড় ভাই ও সাবেক এমপি প্রয়াত নাসিম ওসমানকে স্মরণ করে শামীম ওসমান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের গ্যাসের সমস্যা সমাধানে নাসিম ওসমান কাজ করেছেন। আর তখনই আইভীর আঁতে ঘা লেগে যায়। অনুগামী একজন কাউন্সিলরকে দিয়ে গোদনাইলে মামলা ঠুকে দেন। বন্ধ হয়ে যায় গোদনাইল থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত গ্যাসের পাইপ সংযোগ স্থাপনের কাজ।’ তিনি বলেন, ‘শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিলেন নাসিম ওসমান। বিদেশি ফান্ডও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু হয়তো সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী, যিনি দুর্নীতির কারণে বিদায় হয়েছেন, তাঁকে দিয়ে কোনো বাধা দিয়েছেন আইভী। এখন আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন। আশা করছি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হবে।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শামীম ওসমান কত বড় আত্মত্যাগ করেছেন তা একমাত্র আমিই জানি। কেননা আমি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে আইভীর পক্ষে নির্বাচন করেছি। পরিশেষে সেই আইভী আমাকে দিয়েছে প্রহসন, যন্ত্রণা আর তিরস্কার।’ মেয়র আইভীর দুর্নীতির বিচার চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও দুর্নীতি করি না, অন্যকেও করতে দেব না।’

সমাবেশে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ইসরাত জাহান স্মৃতি, কামরুল হাছান মুন্না, আলমগীর হোসেন, আলাউদ্দিন আলাল, দুলাল প্রধান, আনোয়ার হেসেন আনু, জান্নাতুল ফৌরদোস নীলা, রেহানা আক্তার ও হাছান প্রধানসহ ২৬ জন কাউন্সিলর জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, তাঁরা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হয়েও নির্যাতিত। তেমন কোনো কাজ করতে পারেননি। সিটি করপোরেশনের মেয়রের দুর্নীতি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এ দুর্নীতির সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যে দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে তা তো কিছুই না। আরো বড় বড় দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে। মেয়রের ঘনিষ্ঠ বিতর্কিত ঠিকাদার সুফিয়ানের ভয়ে এত দিন তাঁরা কিছু বলতে পারেননি। এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।

সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট মঞ্জুরুল হক, বিকেএমইএর সহসভাপতি জি এম ফারুক, ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন সাহা, বাংলাদেশ হোসিয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম সজল, জেলা বারের সাধারণ সম্পাদক হাছান ফেরদৌস জুয়েল, নিউজপেপারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এস এম ইকবাল রুমী, বিএমএর সভাপতি ডা. শাহনেওয়াজ, সম্মিলিত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান, অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সভাপতি ইব্রাহীম চেঙ্গিস, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মাসুদুর রহমান খসরু ও নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সভাপতি মাহমুদ হোসেন। স্থানীয় রাজনীতিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, বন্দর আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ রশীদ, সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি ইয়াসিন মিয়া, জাসদের সভাপতি এম এ ছাত্তার, জাতীয় পার্টির সভাপতি আবু জাহের, নারায়ণগঞ্জ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের সভাপতি শংকর সাহা, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি কমান্ডার গোপীনাথ দাস, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি চন্দন শীল, ক্লথ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রবীর সাহা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার অ্যাডভোকেট নূরুল হুদা, যুবলীগ নেতা শাহ নিজাম, শাহাদাত হোসেন সাজনু প্রমুখ।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়রের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে জোরালো অভিযোগ তোলেন স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান। গত ৪ মার্চ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তিনি এ বিষয়ে দেশবাসীকে জানানোর জন্য কয়েকটি লিখিত প্রশ্ন উপস্থাপন করেন। তাঁর প্রশ্ন ও অভিযোগের সূত্র ধরেই তদন্ত কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। চার মাসের মাথায় তদন্ত শেষ হয়। চলতি মাসেই এ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনটি স্থানীয় সরকার বিভাগে জমা দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে সিটি মেয়রের দুর্নীতি প্রমাণ হওয়ায় দুদককে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

সুরুজ বাঙালীশেষের পাতা
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান বলেছেন, দুদককে দুর্নীতির তদন্ত করতে না দিলে জনগণের আদালতে যে বিচার হবে তা হবে কঠোর। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, 'দুর্নীতি থেকে বাঁচতে আপনি রাতদিন ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করছেন। রথী-মহারথীদের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। কিন্তু এবার...