87821_x1
হাওরপাড়ের মানুষের দিন কাটছে এখন অভাব-অনটন ও নানা বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। কারণ হিসেবে হাওরবাসী বলেছেন, হাওরের মধ্যে বসবাস করেও জাল দিয়ে হাওর থেকে মাছ শিকার করতে পারছেন না, বরং রাতের আঁধারে মাছ ধরতে গিয়ে চোরের অপবাদ মাথায় নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে আইনগত জটিলতার কারণে বছরখানেক ধরে বড়ছরা, ছারাগাঁও, বাগলীসহ তিনটি শুল্কস্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় হাওরপাড়ের কয়লা শ্রমিকরা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। ইতিমধ্যে এলাকায় কাজকর্ম না থাকায় অনেকেই জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন শহরে চলে গেছেন। উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হোসেন খান ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেছেন, এলাকায় কাজকর্ম না থাকায় ছেলেমেয়েদের প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৫০ থেকে ৬০টি পরিচয়পত্র ও নাগরিক সনদপত্র দিতে হচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে কাজকর্ম করার জন্য। টাংগুয়া হাওরপাড়ের গোলাবাড়ী গ্রামের সবুজ মিয়াসহ অনেকেই জানান, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষ অবহেলিত হাওরপাড়ের অসহায় লোকজন কেমন আছেন, তার খোঁজখবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। অথচ ভোটের সময় হাওরবাসীর দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও কষ্টের সময় তাদের পাওয়া যায় না। বর্ষা মওসুমে প্রতিনিয়ত নিয়তিকে মেনে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে হাওরপাড়ের মানুষ। হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, হাওর এলাকার মানুষের বর্ষাকালীন জীবনচিত্র বড়ই করুন। হাওরপাড়ের যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার মধ্যে চলছে হাওরবাসীর দৈনন্দিন জীবন। সূত্রে জানা যায়, উপজেলার উত্তর শ্রীপুর, দক্ষিণ শ্রীপুর, উত্তর বড়দল, দক্ষিণ বড়দল তাহিরপুর সদর, বাদাঘাট, বালিজুড়ি ইউনিয়নসহ ৭টি ইউনিয়নের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন হলো শুকনো মওসুমে ধান চাষ করা ও বর্ষা মওসুমে হাওরে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা। বাকি ১৫ ভাগ মানুষ বালু-পাথর ও কয়লা ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। হাওরপাড়ের কৃষকদের প্রতি বছরই বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও খড়ার করাল গ্রাসে কৃষকের কষ্টের ফলানো সোনালি ফসল নষ্ট হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ার পরও যে ধান তার গোলায় তোলেন তা দিয়ে কৃষকদের কোন ধরনের জীবন চলে এলেও মহাজনদের কাছ থেকে সুদ নিয়ে চলতে হয়। অবহেলিত এসব হাওরপাড়ের বসতবাড়ির উঠানে বর্ষা মওসুমে ২-৩ মাস ধরে কোমর পানি থেকে হাঁটুপানি পর্যন্ত। তখন অসহায় মানুষগুলো জেলখানার বন্দিদের মতো পরিবার পরিজন নিয়ে সীমাহীন কষ্টের মধ্যে বসবাস করেন বসতবাড়িতে। মন্দিয়াতা গ্রামের ছয়ফুল মিয়া জানান, হাওরপাড়ে বন্যা প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় হাওর এলাকার লোকজনকে সব সময় বন্যা মোকাবিলা করে করে বাঁচতে হয়। বড়দল গ্রামের সানজব উস্তার জানান, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে হাওরপাড়ের মানুষ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। হাওরপাড়ের ছেলেমেয়েদের সর্বোচ্ছ বিদ্যাঙ্গন হচ্ছে, পাঠশালা, স্কুল ও মাদরাসা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। হাওরপাড়ের যে কয়েকজন কলেজে লেখাপড়া করছে তা আবার অন্যত্র থেকে। মাটিয়ান গ্রামের মাসুক মিয়া জানান, হাওরপাড়ের গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সব সময় শিক্ষক সংকট লেগে থাকে। শিক্ষকদের হাওরপাড়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়া হলেও তাদের বেশির ভাগ অনুপস্থিত থাকেন। আর যারা কর্মস্থলে আসেন তাদের অনেকেই কয়েক দিন পর তদবির করে অন্যত্র বদলি নিয়ে চলে যান। হাওরপাড়ের এক শিক্ষক ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না থাকায় শিক্ষকরা হাওরপাড়ের বিদ্যালয়গুলোতে বেশিদিন থাকতে চান না। সোলেমানপুর গ্রামের হবিকুল মিয়া বলেন, হাওরপাড়ের মানুষের আর্থিক দৈন্যতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ার কারণে ছেলেমেয়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। ঝাড়ফুক, মসজিদের ইমামের পানিপড়া ও স্থানীয় চিকৎসকদের সেবাকে অবলম্বন করে তাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে। জামালপুর গ্রামের নিদুপাল বলেন, হাওরপাড়ের বেশির ভাগ মানুষের চিকিৎসাক্ষেত্র হলো কমিউনিটি ক্লিনিক, সাবসেন্টার ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কমিউনিটি সেন্টার ও সাবসেন্টার প্রায় সময়ই বন্ধ থাকে। এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে যারা কর্মরত আছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বেশির ভাগ অনুপস্থিত থাকেন। হাওরপাড়ে সঠিক চিকিৎসাসেবার কারণে জীবাণুঘটিত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, সর্দিজ্বর হয়ে প্রতি বছরই বিনা চিকিৎসায় মারা যায় অনেক শিশু-কিশোর। হাওরপাড়ে অশিক্ষার কারণে খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, হত্যা-আত্মহত্যা, চোর-ডাকতের উপদ্রুপ ইতিমধ্যে খুব বেশি দেখা দিয়েছে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে সংঘর্ষ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনা ঘটলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা হাওরপাড়ের গ্রামগুলোতে সহজে পা বাড়ান বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। ‘আমরা হাওরবাসী’ প্রধান সমন্বকারী রুহুল আমীন ক্রাইম রিপোর্টার ২৪.কমকে বলেন, আমরা হাওরাঞ্চলের মানুষের দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছি ‘হাওরবাসীর জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়’ গঠন করার জন্য। সরকার যদি হাওর এলাকার উন্নয়নের কথা চিন্তা করে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করে তাহলে হাওরবাসীর দুঃখ-কষ্ট দূর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সুরুজ বাঙালীএক্সক্লুসিভ
হাওরপাড়ের মানুষের দিন কাটছে এখন অভাব-অনটন ও নানা বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। কারণ হিসেবে হাওরবাসী বলেছেন, হাওরের মধ্যে বসবাস করেও জাল দিয়ে হাওর থেকে মাছ শিকার করতে পারছেন না, বরং রাতের আঁধারে মাছ ধরতে গিয়ে চোরের অপবাদ মাথায় নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে আইনগত জটিলতার কারণে বছরখানেক ধরে বড়ছরা,...